ইশতেহারে প্রতিশ্রুত ইসির ৩ প্রকল্প অনিশ্চয়তায়
Printed Edition
- বাস্তবায়নে খরচ লাগবে এক হাজার ২৯৩ কোটি টাকা
- সরাসরি নাগরিক সেবার সাথে জড়িত এই উদ্যোগগুলো
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার ও নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রস্তাব করা হয়েছিল একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প; কিন্তু নাগরিক সেবার সাথে সম্পর্কিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন এখন অনিশ্চয়তায়। কোনোটি একনেকে অনুমোদন পায়নি, কোনোটি এখনো প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির পর্যায়ে, আবার কোনোটি বর্তমান এডিপিতে স্থগিত রেখে নতুন করে সাজানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন ও নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আর এই তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন এক হাজার ২৯২ কোটি ৮৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। তিনটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ প্রস্তাব ছিল তিন বছর।
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের নথির তথ্য বলছে, নির্বাচন কমিশনের অবকাঠামো, এনআইডি সেবা ও জনবল উন্নয়নে প্রায় ৪৯৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের আগেই আটকে গেছে। পাশাপাশি ৬৪ জেলায় এনআইডি সংশোধন দ্রুত করার এবং নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন পর্যায়ে যেতে পারেনি। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন শুরুর সময় আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে, যা ২০২৯ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার কথা। এখন অনুমোদনই পাচ্ছে না।
৪৯৩ কোটি টাকার প্রকল্পে একনেকের ‘না’
পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে ‘নির্বাচনী তথ্য ব্যবস্থাপনার কাজে উপজেলা বা থানা, জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের জন্য নিজস্ব ভবন নির্মাণ’ নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ মেয়াদের এ প্রকল্পে জিওবি অর্থায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪৯২ কোটি ৮৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের নির্বাচন অফিসের জন্য নিজস্ব ভবন নির্মাণের পাশাপাশি নির্বাচনী তথ্য ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধিই ছিল এ উদ্যোগের লক্ষ্য। কিন্তু প্রকল্পটি প্রথমবারেই অনুমোদনের মুখ দেখেনি। এর আগে একই ধরনের উদ্দেশ্যে ‘নির্বাচনী ডাটাবেজের জন্য উপজেলা বা থানা, জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসারের কার্যালয় ও সার্ভার স্টেশন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্প একনেকের চলতি বছরের ১৩ মে’র সভায় অনুমোদিত হয়নি। এখন প্রকল্পটির পরিধি ও উদ্দেশ্য নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে এ প্রক্রিয়াকে পরিধি পুনর্নিধাারণ এবং নতুন উদ্দেশ্যে ব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিপুল অর্থের এই প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারেনি; বরং নতুন কাঠামোয় পুনরায় প্রস্তাব করার প্রস্তুতি চলছে।
৬৪ জেলায় এনআইডি সেবা দ্রুত করা : নির্বাচন কমিশনের দ্বিতীয় প্রকল্পটি সরাসরি নাগরিকসেবার সাথে সম্পর্কিত। ‘৬৪ জেলায় এনআইডি কার্ড সংশোধন ত্বরান্বিতকরণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে জেলাপর্যায়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন কার্যক্রম দ্রুত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯। তবে প্রকল্পটির কাজ এখনো পরিকল্পনা পর্যায়েই রয়েছে। যেখানে প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন শুরুর সময় চার মাস বাকি। পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, কারিগরি প্রকল্প প্রস্তাবনা (টিপিপি) প্রণয়নের কাজ চলছে। এমনকি প্রকল্পের নামও পরিবর্তন করে পরে নতুন প্রস্তাব পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
পুনর্গঠনের অপেক্ষায় প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্পও : নির্বাচন কমিশনের জনবলকে আরো দক্ষ করে তুলতে ‘নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই)-এর সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ নামে তৃতীয় প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকালও জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনশক্তি তৈরিই এর মূল লক্ষ্য। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা, যা সম্পূর্ণ জিওবি খাত থেকেই অর্থায়ন হবে। কিন্তু প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন পর্যায়ে যেতে পারেনি। বর্তমান এডিপিতে প্রকল্পটি স্থগিত রেখে সংশোধিত এডিপিতে পুনর্গঠন করে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইশতেহারের অঙ্গীকার বনাম প্রকল্প বাস্তবায়ন : ইসির তিনটি প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করলে নির্বাচন কমিশনের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি চিত্র পাওয়া যায়। তিনটি প্রকল্প তিন ধরনের জটে রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে তিনটি উদ্যোগকেই নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এর গণতন্ত্র অধ্যায়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইশতেহারে নির্বাচনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু ইশতেহারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায়নি, একটি প্রকল্পের টিপিপি তৈরি হচ্ছে এবং অন্যটি সংশোধিত এডিপিতে পুনর্গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের অবকাঠামো ও সক্ষমতা বৃদ্ধির এসব উদ্যোগ বাস্তবে কত দ্রুত এগোয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে উপজেলা থেকে আঞ্চলিক পর্যায় পর্যন্ত নির্বাচন অফিসের নিজস্ব অবকাঠামো, এনআইডি সংশোধন সেবা দ্রুত করা এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো নির্বাচন ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে উপরোক্ত প্রকল্পগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখন প্রকল্পগুলোর পুনর্গঠন, টিপিপি প্রণয়ন ও সংশোধিত এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির পরই এগুলোর বাস্তব অগ্রগতি স্পষ্ট হবে।
তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা শুধু নির্বাচন আয়োজনের সময়কার প্রস্তুতির বিষয় নয়, ভোটার তালিকা, এনআইডি সেবা, নির্বাচনী তথ্য সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ের অবকাঠামো এবং কর্মকর্তাদের দক্ষতা- সবকিছুর ওপর একটি কার্যকর নির্বাচনব্যবস্থা নির্ভর করে। তাই এসব প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যও পিছিয়ে যেতে পারে।