জাতীয় সংসদে তীব্র বিতর্ক, দীর্ঘ আলোচনা-সমালোচনা এবং নানামুখী রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের পর চূড়ান্তভাবে পাস হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের বার্ষিক খতিয়ান বা নিছক কোনো আর্থিক দলিল নয়; বরং এটি হলো ক্ষমতাসীন সরকারের আগামী এক বছরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের সুস্পষ্ট দর্পণ। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এই বিশাল অঙ্কের বাজেটটি যখন কণ্ঠভোটে পাস হয়, তখন সরকারি দলের পক্ষ থেকে একে একটি যুগান্তকারী, জনবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নমুখী বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অন্য দিকে, সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী দলগুলো এর তীব্র সমালোচনা করে একে ‘অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ ও অবাস্তবায়নযোগ্য’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই বাজেটের বিপক্ষে সরাসরি ‘না’ ভোট দিয়েছেন। মূলত এবারের বাজেট পাসের পর দেশের রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল সরকারের একক সাফল্যের আখ্যান নয়; বরং এটি বিরোধী দলের চাপ, সরকারের আপস এবং সামষ্টিক অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোর এক জটিল সমীকরণ। একটি নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের কিছু প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি রয়ে গেছে গভীর শঙ্কা ও কাঠামোগত ত্রুটি।

এবারের বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে অর্থবিলে আনা বেশ কিছু যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী। প্রস্তাবিত বাজেটে এমন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা নিয়ে সাধারণ মানুষ, অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক ক্ষোভ, উৎকণ্ঠা ও হতাশা তৈরি হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে সরকার সেই বিতর্কিত প্রস্তাবগুলো থেকে সরে এসেছে, যা জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলো ব্যক্তি-শ্রেণীর করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকায় উন্নীত করা। এ ছাড়া আবাসন খাতে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার অনৈতিক ও বৈষম্যমূলক সুযোগটি বাতিল করা হয়েছে। মুদিদোকান বা ক্ষুদ্র খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর প্রস্তাবিত নির্দিষ্ট বা প্যাকেজভিত্তিক ভ্যাট প্রত্যাহার করা এবং ব্যাংক রেজুলিউশন আইনের একটি বিতর্কিত বিধান বাদ দেয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলোও সাধুবাদ পেয়েছে।

সরকার এই সংশোধনীগুলোকে জনমতের প্রতি তাদের সংবেদনশীলতা, নমনীয়তা ও গণতান্ত্রিক উদারতা হিসেবে প্রচার করছে। কিন্তু সংসদের বিরোধী দলগুলোর দাবি ও বয়ান সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজেট পাসের পর সংসদ ভবন চত্বরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিরোধী দলের মুখপাত্র অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেছেন- সরকারের কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সদিচ্ছা থেকে নয়; বরং বিরোধী দলের অব্যাহত চাপ এবং সংসদে তাদের গঠনমূলক ও জোরালো ভূমিকার কারণেই সরকার এই ‘গণবিরোধী’ প্রস্তাবগুলো সংশোধন বা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে। বিরোধী দলের এই দাবি একেবারে অমূলক বা ভিত্তিহীন নয়। কারণ সংসদে তাদের জোরালো প্রতিবাদ ও জনমতের চাপ না থাকলে হয়তো প্রস্তাবিত বাজেটটি অপরিবর্তিত অবস্থাতেই পাস হয়ে যেত। তবে কারণ যাই হোক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে এই সংশোধনীগুলোর ফলে দেশের সাধারণ করদাতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যে উপকৃত হয়েছেন, তা অনস্বীকার্য।

তবে কয়েকটি জনবান্ধব সংশোধনী আনা হলেও বাজেটের মূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং অর্থায়নের উৎসগুলো নিয়ে বিরোধী দলের উত্থাপিত শঙ্কাগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক এবং গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বিরোধী দলের মুখপাত্রের মতে, সরকার কিছু ন্যায্য দাবি মেনে নিলেও বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে বিশাল কাঠামোগত দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ও আতঙ্কের জায়গাটি হলো দেশের বর্তমান ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি রাখা হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থা থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার বিপুল ঋণ নেয়ার যে পরিকল্পনা করেছে, তা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চরম অবাস্তব ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিরোধীরা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অত্যন্ত যৌক্তিক একটি প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাত চরম তারল্য সঙ্কটে ধুঁকছে। অনেক ব্যাংক সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের টাকা পর্যন্ত ঠিকমতো ফেরত দিতে পারছে না। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাধ্য হয়ে টাকা ছাপিয়ে বা বিশেষ আর্থিক সহায়তা দিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে। যে ব্যাংকগুলো নিজেরাই টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ, সেখান থেকে সরকার কিভাবে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঋণ গ্রহণ করবে, তার কোনো যুক্তিসঙ্গত, বৈজ্ঞানিক বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বাজেটে দেয়া হয়নি।

এর পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রাগুলোর মধ্যে যে একটি বড় ধরনের পরস্পরবিরোধী অবস্থান রয়েছে, তা বিরোধী দলের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু একদিকে বাজার থেকে বিপুল ব্যাংকঋণ গ্রহণ এবং অন্য দিকে টাকা ছাপানোর মতো সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলে এই মূল্যস্ফীতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। উল্টো সরকারের এই বিশাল ব্যাংকঋণের কারণে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ চরমভাবে সঙ্কুুচিত হবে, যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। বেসরকারি খাত পর্যাপ্ত ঋণ না পেলে দেশে নতুন শিল্পকারখানা ও বিনিয়োগ হবে না, কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা আরো দীর্ঘায়িত হবে। এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্যগুলোর কারণেই বিরোধী দল বাজেটটিকে অবাস্তবায়নযোগ্য আখ্যা দিয়ে এর বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, যা একেবারে অমূলক নয়।

কেবল অর্থনৈতিক প্রস্তাবনাগুলোই নয়, সংসদে আইন প্রণয়ন ও বিল উত্থাপনের পদ্ধতিগত দিক নিয়েও বিরোধী দল অত্যন্ত গুরুতর এবং গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পরিপন্থী কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, যেকোনো বিল সংসদে উত্থাপনের অন্তত তিন দিন আগে তার কপি সংসদ সদস্যদের হাতে পৌঁছানোর কথা, যাতে তারা বিলটি পড়ে বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। কিন্তু বিরোধী দলের অভিযোগ, বর্তমানে যেদিন বিল উত্থাপন করা হয়, ঠিক সেদিনই সদস্যদের হাতে কাগজ ধরিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে বিলের ওপর কোনো অর্থবহ, গভীর ও গঠনমূলক আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও প্রাণবন্ত সংসদের জন্য এ ধরনের চর্চা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। তাড়াহুড়ো করে আইন পাসের এই প্রবণতা সংসদীয় জবাবদিহির ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং আইনের ফাঁকফোকর থেকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

তবে সব কিছুর বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে, সংসদে সদ্য পাস হওয়া ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’-এর মতো যুগোপযোগী আইনকে বিরোধী দল সর্বসম্মতিক্রমে স্বাগত জানিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, জনস্বার্থের প্রশ্নে তারা সরকারের ভালো উদ্যোগের পাশে রয়েছে। কিন্তু আইনটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশকে যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই কম্পিউটার ও সার্ভার জব্দ করার ক্ষমতা, তা নিয়ে তারা গভীর আইনি শঙ্কা প্রকাশ করেছে। ফৌজদারি কার্যবিধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এ ধরনের পদক্ষেপে ন্যূনতম একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করার বিধান না রাখায় ভবিষ্যতে এই আইনের অপব্যবহার এবং সাধারণ নাগরিকদের হয়রানির আশঙ্কা থেকে যায়। অন্য দিকে ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল শিক্ষা-সংক্রান্ত বিল’টির বিষয়ে বিরোধী দল মনে করে, এটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন। উচ্চশিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঠেলে দেয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে আরো নিবিড় পর্যালোচনার প্রয়োজন ছিল।

সবশেষে, দেশের সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলন এবং ‘জুলাই সনদ’-এর বাস্তবায়নের প্রশ্নে বাজেটে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিরোধী দল যে অভিযোগ তুলেছে, তা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধী দলের মতে, জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের যে মূল চেতনা বা জুলাই সনদের যে প্রস্তাবনা, তা কেবল সংবিধানের কয়েকটি ধারা সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বস্তরে আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার। এই সংস্কারপ্রক্রিয়াকে একটি যৌক্তিক কাঠামোয় আনার জন্য বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সরকার ও বিরোধী দলের সমান সংখ্যক প্রতিনিধির সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি জাতীয় সংস্কার কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়া হলেও সরকারের দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এমনকি বাজেটে জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা বা কাঠামোগত বরাদ্দ রাখা হয়নি। নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য কিছু আর্থিক অনুদান ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এই বাজেটে নেই বলে বিরোধীরা মনে করেন।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সদ্য পাস হওয়া বাজেটটি দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট হলেও, এটি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরীক্ষায় পুরোপুরি উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সরকার শেষ মুহূর্তে কিছু জনবান্ধব সংশোধনী এনে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করলেও, সামষ্টিক অর্থনীতির মূল সঙ্কটগুলো, যেমন- ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা, মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপ, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের খরা এবং রাজস্ব আদায়ের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা- অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা এবং যৌক্তিক আপত্তিগুলো প্রমাণ করে, সংসদে একটি শক্তিশালী ও সোচ্চার বিরোধী কণ্ঠস্বর থাকা কতটা জরুরি। বাজেট পাস হওয়াটাই সরকারের চূড়ান্ত বিজয় নয়; বরং এই বাজেট বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সরকারকে যে কঠিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, তা নিখুঁতভাবে মোকাবেলা করাই হবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। একটি টেকসই, বৈষম্যহীন ও মজবুত অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। সরকার যদি বিরোধী দলের এই শঙ্কাগুলো আমলে নিয়ে অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী ও সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে বিশাল অঙ্কের এই বাজেট শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য একটি বোঝা হয়েই দেখা দিতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

rintuanowar.com