বাংলাদেশের পূর্বে পাহাড়-পর্বত ঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম যা মোট ভূখণ্ডের এক দশমাংশ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। অন্য দিকে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ছয় হাজার ১৭ কিলোমিটারজুড়ে বিরাজ করছে বিশ্বের বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এই বনভূমির মোট আয়তন ১০ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশে পড়েছে ছয় হাজার ১৭ কিলোমিটার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাকিটা। এ ছাড়া আমাদের আছে দু’টি সমুদ্রবন্দর ও বিশাল উপকূল, যার দৈর্ঘ্য ৫৮০ কিলোমিটার। অর্থাৎ কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল বিশ্ববাসীর কাছে এক বিস্ময়। আরো বিস্ময় হচ্ছে, ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ। এ ছাড়া ৫৮০ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে আছে ২০০ নটিক্যাল মাইলের অর্থনৈতিক জোন। আছে বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি, যা আমাদের খাদ্যের জোগান দেয়।

কেউ যদি পবিত্র কুরআনুল কারিমের বাণী উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন, তাহলে এর বিস্ময়কর দিক তার কাছে উন্মোচিত হবে। তখন মনে হবে, আল্লাহর এ সৃষ্টিতে অন্যায় হস্তক্ষেপ অর্থ আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতকে অস্বীকার করা কিংবা আল্লাহ প্রদত্ত ভারসাম্যকে ধ্বংস করা। আমরা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি দেখছি; এটি মানুষের ক্রমাগত অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলশ্রুতি। পাহাড় কেটে উন্নয়নের নামে রাস্তা নির্মাণ, বাড়িঘর বানানো কিংবা অপরিকল্পিত নগরায়ন যেমন পাহাড় পর্বতের শক্তি দুর্বল করে দিয়েছে, তেমনি নগরায়নে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে। ভরাট হয়েছে জলাশয়। এ ছাড়া নতুন বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণে প্রতি বছর ১ শতাংশ করে চাষের জমি কমে যাচ্ছে। যার ফলে দেখা দিচ্ছে ফসলের ঘাটতি। অথচ বিস্ময়কর আল্লাহর সৃষ্টি এই দেশ। যেমন পৃথিবীর ১৯৩টি দেশের মধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৪টি দেশ সম্পূর্ণ ভূমিবেষ্টিত। সেদিক দিয়ে ছোট্ট দেশ হিসেবে আমাদের ওই অবস্থান বিরাট সৌভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ এভাবে এই দেশকে আমাদের উপহার দিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও অসচেতন মানুষের হিংস্র তৎপরতায় দেশটি এখন আস্থাহীনতায় ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তনে অসহনীয় পরিস্থিতিতে আছে। প্রচণ্ড হুমকিতে আছে জীববৈচিত্র্য।

মোদ্দা কথা, আল্লাহ কোনো কিছু বৃথা সৃষ্টি করেননি। যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, তা মানুষের কল্যাণে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ বলেছেন- ‘তিনি আকাশ ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যবর্তী সব কিছু নিছক কোনো খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করেননি; বরং সবকিছুর পেছনে মহান প্রজ্ঞা ও উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে।’ (সূরা আম্বিয়া-১৬, দুখান-৩৮)

আল্লাহ পাহাড় পর্বত ও বৃক্ষরাজির মাধ্যমে এমন এক পরিবেশ ও প্রতিবেশ সৃষ্টি করেছেন যা পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করে। এমনকি ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। আল্লাহ পাহাড়কে সৃষ্টি করেছেন পেরেক হিসেবে, যাতে নড়াচড়া না করে ভূপৃষ্ঠের ভারসাম্য রক্ষা হয়। বনভূমি অর্থাৎ গাছপালা ইত্যাদি সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য নিয়ামত হিসেবে। সবকিছু সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, ভারসাম্য ও সুপরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করেছেন তিনি। আল্লাহ বলেন- ‘আমি প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাণে।’ (সূরা কামার-৪৯) আর ভারসাম্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- ‘আসমান ও জমিনকে ছয় স্তরে সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই সাথে সবকিছুতে ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে।’ একইভাবে আল্লাহ সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন, বিশাল খাদ্য ভাণ্ডার, সম্পদ ও যোগাযোগের জন্য। সমুদ্রের লোনা পানি পৃথিবীর সব বর্জ্য পরিশুদ্ধ করে। আল্লাহ সূরা আর রহমানে বারবার বলেছেন- ‘তোমরা আমার কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে।’ এ থেকে এটা স্পষ্ট, আল্লাহ বাংলাদেশের জনগণের জন্য এমন একটি ভূখণ্ড উপহার দিয়েছেন, যা পূর্ব দিকে পাহাড়-পর্বত, দক্ষিণে বিশাল সমুদ্র ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রহস্য ঘেরা বিশাল সুন্দরবন।

সম্প্রতি আমরা কয়েকজন সাংবাদিক বিশাল বনভূমি সুন্দরবন ঘুরে এসেছি। এটি ছিল ‘চেঞ্জ ইনেশিয়েটিভ ও বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের (এফইজেবি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত একটি স্টাডি ট্যুর। অবাক ও বিস্ময় ভরা এই বনাঞ্চল সবসময় আমাদের আকৃষ্ট করে থাকে চুম্বকের মতো। এ বনভূমি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনভূমি হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ লবণাক্ত পানিতে বেড়ে ওঠা বনাঞ্চল যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে রক্ষা করে। বহু বহুকাল ধরে এই বনভূমি মানুষের মধ্যে রোমাঞ্চ ও ভীতি সঞ্চারণ করে আসছে। কিন্তু অবহেলা, অযত্ন ও লোভী মানুষের কোপানলে পড়ে বিপন্ন হওয়ার মুখে সুন্দরবন।

এক দিকে অর্থ লোলুপ মানুষের হিংস্র তৎপরতা; অন্য দিকে উজান থেকে আসা পানিপ্রবাহের স্বল্পতা, লবণাক্ত পানির বিস্তার উজানে আরো বহু দূরে চলে গেছে; যা ফসল উৎপাদনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। মাছ ধরার ব্যাপারে কঠোরতা থাকায় জেলেরা গোপনে পানিতে বিষ ঢেলে মাছ শিকার করে তা বাজারে বিক্রি করছেন, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ছাড়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এ বনভূমিকে বিপন্ন হওয়ার মুখে ফেলে দিয়েছে। রাতে আমরা যখন জাহাজে করে রামপাল অতিক্রম করছিলাম তখন স্পষ্টভাবে চোখে পড়ল পশুর নদীর এপার এবং ওপারের মধ্যকার পার্থক্য। অর্থাৎ- যে পারে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত সেপারে কালো ধোঁয়ায় আকাশে আবরণ সৃষ্টি হয়েছে। অন্য পাশে বেশ পরিষ্কার আকাশ। এ ছাড়া ধোঁয়া মিশ্রিত কয়লার কণা বাতাসে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ায় জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হুমকিতে পড়েছে। এটি ভারতের একটি কোম্পানি নির্মাণ করছে। এর ফলে বাংলাদেশ মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও আছে।

সুন্দরবনে যেমন আছে বিভিন্ন জাতের গাছ-গাছালি; তেমনি আছে নানা প্রজাতির পাখি, প্রাণী, মাছ, সরীসৃপ ইত্যাদি। ২০১৪-১৫ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে ১৮৪ জাতের গাছ ও গুল্ম আছে। এর মধ্যে আছে ৫৪ জাতের বড় গাছ, ২৮ জাতের লতাপাতা, ২২ জাতের গুল্ম এবং অন্যান্য জাতের গাছ, ফারন, অর্কিডও অন্তর্ভুক্ত। প্রধান গাছ হলো- সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুর, বাইন ইত্যাদি। এ ছাড়া সুন্দরবনে ৪৫৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী আছে। এর মধ্যে সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী, ১২৫টির মতো বাঘ আছে। ৪২ থেকে ৫০ প্রজাতির চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর, বানর, মেছোবিড়াল ইত্যাদি প্রাণী আছে। আরো আছে প্রায় ৩৫ থেকে ৫৫ প্রজাতির সরীসৃপ, যার মধ্যে লবণাক্ত পানির কুমির, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, কচ্ছপ ইত্যাদি।

এখন যেসব পশু, পাখি ও প্রাণীর হিসাব দেয়া হয়েছে শত বছর আগে এসবের সংখ্যা বহু গুণে বেশি ছিল। পশুর নদী দিয়ে চলার সময় আগে প্রচুর পাখি বিশেষ করে চিলের উড়াউড়ি দেখেছি। কিন্তু এবার অল্প কিছু চোখে পড়ল। আরো বিস্ময়কর, গভীর জঙ্গলের মধ্যে আমরা যখন নীরবতা পালন করছিলাম, তখন পাখির ডাক খুব কম শুনেছি। ভাবছিলাম এটিই কী সেই চিরচেনা সুন্দরবন? দু’-একটা বিচ্ছিন্নভাবে ছাড়া দল বেঁধে চলা হরিণের পাল চোখে পড়েনি। একইভাবে দু’-একটি শূকর চোখে পড়েছে। করমজল ইকো পার্কে কিছু বানরের দেখা পেলাম। তাদের খুব ক্ষুধার্ত মনে হচ্ছিল। এ ব্যাপারে কথা হচ্ছিল ইংরেজি দৈনিক নিউ ন্যাশনের সাবেক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের বর্তমান সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদারের সাথে। তিনি বহু বছর ধরে পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করছেন। ডাস্টবিনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, দেখুন বানরটি কিভাবে ডাস্টবিন থেকে খাদ্য কুড়িয়ে খাচ্ছে। এ ছাড়া তারা খাবারের জন্য থাবা মারছিল মানুষের হাতে। মনে হলো কতদিন যেন পেটপুরে খেতে পায়নি। অনেক বাঘ যেমন খাবারের অভাবে পশ্চিমবঙ্গের বনভূমিতে চলে গেছে। সেখানে কৃত্রিম বনায়ন করে বাঘের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মোস্তফা কামাল মজুমদার ওই প্রসঙ্গ টেনে আবার বললেন, পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সাংবাদিকদের উচিত তাদের সঞ্চিত বা অর্জিত অভিজ্ঞতা মানুষের দৃষ্টিতে নিয়ে আসা। সেই সাথে তা বাস্তবে প্রয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করা। তবে সবকিছু মিলিয়ে কয়েক বছর আগের তুলনায় সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশের বেশ উন্নতি হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসী এবং বনকর্মীরা তা-ই বললেন। এ ব্যাপারে বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এবং পরিবেশবিদ জাকির হোসেন খানের। তিনি সফরকালে তুলনামূলক আলোচনা করে বলেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় বর্তমানে কিছু অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, বাঘের সংখ্যা বেড়েছে, সংরক্ষণ কার্যক্রম প্রয়োগ শক্তিশালী হয়েছে।

এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও বেশ কিছু ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, উজান থেকে সুস্বাদু পানির প্রবাহ আরো কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব মারাত্মক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি খালবিলে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা, অবৈধ শিকার এবং বিভিন্ন প্রজাতির ধীরে ধীরে বিলুপ্তির ঝুঁকি বেড়েছে। অন্য দিকে জেলে, মৌয়ালসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠী এখনো চাঁদাবাজি, দস্যুতা ও নিরাপত্তাহীনতার মতো ঝুঁকির মুখে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই বলে যে, অনেক ক্ষতিকর তৎপরতা সত্ত্বেও সুন্দরবন এখনো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়নি। যদি আমরা প্রকৃতির অধিকারভিত্তিক শাসনব্যবস্থার সামঞ্জস্য না করি তাহলে আজকের দৃশ্যমান অগ্রগতি আগামী দিনের অপরিবর্তনীয় ক্ষতিতে পরিণত হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক