আশাব্যঞ্জক এক বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনে কাজ করছে সরকার।’ মন্ত্রীর সদিচ্ছাকে সাধুবাদ জানাই। তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমলাতান্ত্রিক কচ্ছপগতিতে কাজ করে। এই ঘুণে ধরা ব্যবস্থার বেড়াজালে আটকে তিনি শেষ পর্যন্ত একজন ‘অসহায় মন্ত্রী’ হিসেবে থেকে যাবেন কি না সেটাই প্রশ্ন।

২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ৯.৭ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৭.৮ শতাংশে। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, স্নাতক ডিগ্রিধারী যুবকদের বেকারত্বের হার এখন ২৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে । উচ্চশিক্ষার এই করুণ দশার পেছনে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা।

ডিগ্রি অর্জনের এই অন্ধ দৌড় আমাদের সম্ভাবনাময় যুবসমাজকে কেবল কর্মহীন ও হতাশ করে তুলছে। এখনই সময় এসেছে একটি আমূল পরিবর্তনের। এই রূপান্তরের অংশ হিসেবে আমাদের চিরাচরিত চার বছরের তাত্ত্বিক ডিগ্রির মোহ ছেড়ে একটি নমনীয় ও দক্ষতা-প্রথম (Skills First) মডেলে প্রবেশ করতে হবে।

এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চ-উপযোগিতাসম্পন্ন মডেলটি সরাসরি অনুসরণ করতে পারে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট জেনারেল পার্ক চুং-হি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সাথে যুক্ত করে কম-প্রয়োজনীয় সাধারণ ডিগ্রি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দেন এবং ইস্পাত, জাহাজ নির্মাণ ও ইলেকট্রনিক্সের মতো নির্দিষ্ট শিল্পের জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরি করেন। এই অর্থনৈতিক বিপ্লব নিশ্চিত করতে তিনি জার্মানির আদলে বিনামূল্যে টিউশন, আবাসন ও শতভাগ চাকরির নিশ্চয়তাসহ উচ্চ-মানসম্পন্ন ভোকেশনাল হাইস্কুল গড়ে তোলেন। কারিগরি শিক্ষাকে মর্যাদাপূর্ণ করার এই যুগান্তকারী কর্মমুখী মডেলটি বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে।

সার্টিফিকেট-সর্বস্ব আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক লজ্জাজনক চিত্র দেখা গেছে সম্প্রতি পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিয়োগে। সেখানে মাত্র ১৮টি ‘অফিস সহায়ক’ (পিয়ন) পদের বিপরীতে নিয়োগ পাওয়া ১৭ জনই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ও মাস্টার্স পাস করা উচ্চশিক্ষিত তরুণ। অর্থনীতিবিদেরা একেই বলছেন Jobless Growth (জবলেস গ্রোথ), যেখানে কাগজে-কলমে দেশের জিডিপি বাড়ছে, অথচ বাস্তবে শিক্ষিত তরুণেরা বেঁচে থাকার তাগিদে পিয়নের চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

দীর্ঘ তাত্ত্বিক পাঠের পরিবর্তে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, অটোমেটেড ম্যানুফ্যাকচারিং, ক্লাইমেট-স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি দক্ষতাভিত্তিক সার্টিফিকেট চালু করতে হবে। এই কারিকুলামকে দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মেগা-প্রকল্পগুলোর তাৎক্ষণিক চাহিদার সাথে আইনিভাবে যুক্ত করতে হবে। চীনের অর্থনৈতিক সফলতার মতো আমাদেরও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে সেগুলোকে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে রূপান্তরের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত, যেখানে রোবোটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর মতো বাজারমুখী বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হবে।

তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের প্রধান বাধা আমাদের ক্যাম্পাসগুলোর লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি, যা বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যখন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের উপাচার্য পদ রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে পূরণ করা হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আমাদের দেশে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে কার্যত একটি সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তুলেছে। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক অপব্যবহার উচ্চশিক্ষাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ভারতের ছাত্রসংগঠনগুলো থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। তারা মূলত আদর্শিক চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিষয়গুলো কঠোরভাবে অফিসিয়াল প্রশাসনের হাতেই ন্যস্ত থাকে। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির কারণে কোনো বিশৃঙ্খলা বা একাডেমিক স্থবিরতা তৈরি হলে উপাচার্যকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। এজন্য চাকরি হারানোর নজিরও আছে।

সম্প্রতি এক সরকারি কলেজ শিক্ষকের বদলির আদেশ বাতিল করে আগের কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে একজন ছাত্রনেতার পক্ষ থেকে বিশেষ আশ্বাসের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা দাবির অভিযোগ সামনে এসেছে। এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে, আমাদের শিক্ষাঙ্গনের নৈতিক পরিবেশ কতটা কলুষিত হয়েছে। যেখানে প্রশাসনিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত উল্টে দেয়ার মতো প্রভাব একটি ছাত্রগোষ্ঠী খাটাতে পারে, সেখানে দুর্নীতি উচ্ছেদ কিভাবে সম্ভব?

এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদগুলো এখনো তাদের শক্তিশালী অ্যাকাডেমিক মান ধরে রাখার চেষ্টা করলেও, তারা জিম্মি হয়ে আছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আইন কিংবা মানবিকের মতো নির্দিষ্ট কিছু অনুষদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিষাক্ত ছাত্ররাজনীতির কাছে। এই অতিগুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষাকে সহিংসতা ও স্থবিরতা থেকে মুক্ত রাখতে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অনুষদগুলোকে মূল শহরের বাইরে পৃথক ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা বিপুলসংখ্যক ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটের নিজস্ব বিষয়ে ন্যূনতম মৌলিক জ্ঞানও নেই। চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে বসে অনেকেই প্রকৌশলবিদ্যার একেবারে প্রাথমিক বিষয়গুলোরও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেন না। ফলে শিল্পকারখানাগুলো দক্ষ জনবলের তীব্র সঙ্কটে পড়ছে। অথচ আমাদের সামনেই সফল উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ডের CSTI (Cooperative Skills Training Institute) এবং বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো কাঠামোবদ্ধ ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার জনবল তৈরি করছে।

দেশের আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মেধাবী সন্তানদের উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত না করে একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে ডাটাভিত্তিক ও মেধা যাচাইয়ের নির্ভুল ব্যবস্থা চালু করতে হবে। মেধার প্রতিটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রমকারীরাই কেবল উচ্চতর গবেষণার সুযোগ পাবে, আর বাকিদের সমাজ ও রাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে দেশের অধিকাংশ সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রযুক্তি ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী যদি সত্যিই উচ্চশিক্ষার উৎকর্ষ চান, তবে তাকে এই ভেঙে পড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থার আমূল ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে উপাচার্য নিয়োগের বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে, ক্যাম্পাস থেকে সমান্তরাল প্রশাসন পরিচালনাকারী নোংরা ছাত্ররাজনীতি এবং চাঁদাবাজির মাফিয়াতন্ত্র উপড়ে ফেলতে হবে। মন্ত্রী মহোদয় যদি এই সাহসী পদক্ষেপগুলো নিতে না পারেন, তবে সিস্টেমের শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও অপশক্তি তাকেই গ্রাস করবে। তিনি যতই সৎ ও সদিচ্ছাসম্পন্ন মানুষ হোন না কেন, দিনশেষে তিনি একজন ‘অসহায় মন্ত্রী’ হিসেবেই চিহ্নিত হবেন।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি