কারো যদি ঘর থাকে, তাহলে ঘরের দরজাও থাকে। দরজা থাকলে অন্তত একটি খিল বা সিটকিনি থাকে। খিল অথবা সিটকিনি নেই, এমন কোনো ঘরে কি নিরাপদ থাকা যায়? কোনো দেশে যদি নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেই দেশের মানুষ আত্মরক্ষা করতে পারবে কি না?
কেউ হয়তো উদাহরণ টেনে আনতে পারেন, অ্যান্ডোরা, মোনাকো, ভ্যাটিকান সিটিসহ আরো কিছু দেশের। ওই দেশগুলোর নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। কিন্তু নিজেদের না থাকলেও প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা তো আছে। অ্যান্ডোরার প্রতিরক্ষা সামলায় ফ্রান্স ও স্পেন। মোনাকোকেও দেখাশোনা করে ফ্রান্স। ভ্যাটিকান সিটির দায়িত্ব ইতালির ওপর। বাংলাদেশ তো অ্যান্ডোরা, মোনাকা কিংবা ভ্যাটিকানের মতো দেশ নয়। আমাদের প্রতিবেশী ‘বন্ধুদেশ’ কি খুব পরীক্ষিত এবং বিশ্বস্ত? আসলে বন্ধুর পরিচয় মেলে বিপদে। কিন্তু যারা আমাদের জন্য প্রতিনিয়ত বিপদ তৈরি করে, তারা কখনো বন্ধু হতে পারে না।
বাংলাদেশের একদিকে পরমাণু শক্তিধর সেই ‘বন্ধুদেশ’। অন্যদিকে অস্থিতিশীল ও গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমার। ‘বন্ধু দেশের’ আচরণ কেমন, তা বুঝতেও বাকি নেই আমাদের। এ অবস্থায় আমাদের দরজায় যদি পোক্ত খিলের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে?
আসলে মানুষের শরীর ঢাকতে যেমন পোশাকের দরকার হয়, একটি স্বাধীন জাতির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দরকার হয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার। কেন এর গুরুত্ব এত? আমরা কি যুদ্ধ করতে চাই? নাকি কোনো যুদ্ধ চেপে বসেছে আমাদের ঘাড়ে?
যারা শহরে থাকেন, তাদের অনেকে ঘর থেকে বের হলে সাথে একটি পানির বোতল নিয়ে বের হন। কারণ কী? তারা কি সাহারা মরু পাড়ি দেবেন? এতটুকু বিষয়ও যারা বোঝেন না, অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করেন, কিংবা জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চান, তারা বলেন— আমাদের গরিব দেশ, খেতে পারি না, পরতে পারি না, আমরা কেন যুদ্ধবিমান কিনতে যাবো?
তাদের এ কথাগুলো মানবিক ও নিরীহ শোনায়। কিন্তু তাদের ‘বিড়াল’ রাখা আছে অন্য কোনো থলের ভেতর। সেই থলের ভেতরে একটি কারখানা আছে। ওই কারখানা থেকে এসব বয়ান উৎপাদন করা হয়। কেবল বয়ান উৎপাদন নয়, ওই কারখানা থেকে কিছু লোকও তৈরি করা হয়। তারা বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষায় দুর্বল করে রাখতে চান।
আমরা কোনো দেশ আক্রমণ করতে যাবো না, এটি সত্য। আক্রমণের ইতিহাসও আমাদের নেই। কারো এক ইঞ্চি ভূখণ্ডের প্রতিও লালসা নেই, আমরা শান্তিকামী। কিন্তু নিজেদের ভূখণ্ড তো শতভাগ নিরাপদ রাখতে হবে।
চীন থেকে ৪.৫ প্রজন্মের জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান, আধুনিক অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও ইউএভি কেনা হবে বলে প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে, সেটি নিয়ে গাত্রদাহ শুরু হয়েছে ‘বন্ধু দেশের’। ‘বন্ধু’র গাত্রে এ দাহ নতুন কিছু নয়। কয়েক দিন আগে সহযোগী একটি দৈনিকে একটি কলাম প্রকাশ হয় সামরিক বিশ্লেষক এ কে এম শামসুদ্দিনের। ওই কলামে তিনি একটি স্মৃতি তুলে ধরেন। তখন সেনাপ্রধান জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান বীর বিক্রম। বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এ কে এম শামসুদ্দিন। তখন বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে ‘সারফেস টু এয়ার মিসাইল’ বা ভূপৃষ্ঠ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। এর জন্য উত্তর কোরিয়ার সাথে চমৎকার একটি সমঝোতাও হয়েছিল। অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল প্রজেক্ট। কিন্তু ‘বন্ধুদেশের’ কূটনৈতিক বাধার মুখে সেটি করা সম্ভব হয়নি। এসব বাধার পেছনের রহস্য কী?
রহস্যটা হলো— বাংলাদেশ যদি নিজেদের আকাশসীমা ৩০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত নিরাপদে রাখতে পারে, তাহলে তাদের ‘দাদাগিরি’ ছুটে যেতে পারে। কারণ তারা জে-১০ সিই এর ক্ষমতা দেখেছে, নাকানি-চুবানি খেয়েছে পাকিস্তানের কাছে। ফরাসি প্রযুক্তির ‘রাফায়েল’ যুদ্ধবিমান যখন পাকিস্তানের আকাশসীমার কাছে পৌঁছায়, তখন জে-১০ সিই বিমানের ডিজিটাল রাডার ক্রস সেকশন ম্যানেজমেন্ট এবং ইলেকট্রনিক ইকো-সিস্টেম রাফায়েলের অপারেটিং সিস্টেম অকেজো করে দেয়। জ্যাম হয়ে যায় মিসাইল ফায়ারিং মেকানিজমও। এতে রাফায়েলের পাইলটরা বারবার বোতাম চেপেও মিসাইল ছুড়তে পারেনি। তাদের ভূমিতেই ধসে পড়ে তাদের রাফায়েল। জে-১০ সিই থেকে ছোড়া চীনা ‘পিএল-১৫’ মিসাইল ৩০০ কিলোমিটার দূর থেকে শত্রুর লক্ষ্যবস্তু গুঁড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ যদি আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার সাথে এ ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ভূরাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশের দিকে চোখ তুলে তাকাবে কে?
এবার কেউ হয়তো বলে বসতে পারেন, বাংলাদেশের সেনাসংখ্যা আর ‘বন্ধু দেশের’ সেনাসংখ্যা কি এক হলো? কিন্তু সামরিক ভূরাজনীতি কেবল খাতায় কষা অঙ্কে চলে না। এ হিসাবে মাথায় রাখতে হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপ্লয়মেন্ট’ বা কৌশলগত অবস্থান। ‘বন্ধু দেশ’ চাইলেই কি নিজেদের সব সেনা বা সামরিক শক্তি বাংলাদেশ সীমান্তে এনে জড়ো করতে পারবে? অসম্ভব! তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় বিশাল চীন সীমান্ত সামলাতে। তারপর আছে পাকিস্তান সীমান্ত। আর কাশ্মিরে তো ঝামেলা বাধিয়ে রেখেছে নিজেরাই। অনেক সেনাকে স্থায়ীভাবে ফেলে রাখতে হয় ব্যারাকে। পাহাড়ে। তাছাড়া আছে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের ঝামেলা। ওখানে সাতবোনের ভেতর থেকে আসা হুমকিগুলোও সামাল দিতে হয়। এসব হিসাব করে দেখুন— বাংলাদেশ যদি তার সীমানায় শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ দেয়াল’ বা ‘ডিট্যারেন্স’ গড়ে তোলে তাহলে কি যথেষ্ট নয়? বিশাল সামরিক সক্ষমতা থাকার পরও ‘বন্ধুদেশের’ পক্ষে আমাদের সামরিক চাপে ফেলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
আমাদের সামরিক বাহিনীর আকার ছোট হতে পারে, কিন্তু পেশাদারত্বে এ বাহিনী উন্নত। জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বছরের পর বছর কাজ করছেন আমাদের সেনারা। শৃঙ্খলা আর বীরত্ব দিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। তাই বলে আমাদের নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। আরো শক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে হলে নিজেদের ঘাটতিগুলোও সততার সাথে বুঝতে হবে।
কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে যে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ঘটে গেল— ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে সাঁজোয়া স্কোয়াড্রনের ট্যাংক থেকে লাইভ-ফায়ারিং অনুশীলনের সময় কোনো এক ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণ হয়। এতে দুই তরুণ অকুতোভয় সেনা সদস্যের মৃত্যু হয়। এক কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় গোটা জাতি শোকাহত।
এ দুর্ঘটনা কি আমাদের সেনাবাহিনীর দুর্বলতা? না, এটি দুর্ঘটনা ঠিক; কিন্তু বিরল নয়। আমেরিকা, ন্যাটোর মতো অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনীতেও এমন ট্যাংক বিস্ফোরণ বা ফায়ারিং মহড়ায় দুর্ঘটনা হয়। লাইভ-ফায়ারিং প্র্যাকটিস মানে এমন ঝুঁকি থেকে যায়। তবে এ ঘটনা থেকে একটি বাস্তবতা স্বীকার করে নিতে হবে— আমাদের সরঞ্জামের অনেক কিছু পুরনো। পুরনো সরঞ্জামে ‘মিসফায়ার’ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
এ ঘাটতি দূর করতে হলে কৌশলগত সংস্কারের দিকে যেতে হবে আমাদের। পুরনো মডেলের ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানগুলোর জায়গায় আধুনিক মেইন ব্যাটেল ট্যাংক আনা যেতে পারে। তাছাড়া ‘ভার্চুয়াল সিমুলেশন ট্রেনিং’ কতটা কার্যকর তা-ও পরখ করে দেখা যেতে পারে। এই ট্রেনিংয়ে আসল গোলা ব্যবহারের ঝুঁকি থাকে না। ভার্চুয়ালি ফায়ারিং প্র্যাকটিসের সুযোগ থাকে এতে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমরাস্ত্র সংগ্রহে আমাদের কোনো একক উৎসের ওপর নির্ভর করা চলবে না। উৎসকে ছড়িয়ে দিতে হবে উন্নত প্রযুক্তির দেশগুলোতে। তাছাড়া নিজেদের গোলাবারুদ ও মাঝারি সমরাস্ত্র দেশে তৈরির সুচিন্তিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
এই ‘এগিয়ে যাওয়া’টা ধীর হলে চলবে না। এগোতে হবে দ্রুত। কারণ প্রতিরক্ষার সঙ্কট এখন আমাদের জন্য দূরের বিষয় নয়। একরকম বলা যায়, ঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়ে গেছে। মিয়ানমার সীমান্তে এখন নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রকট হয়ে উঠেছে। রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর হাত থেকে মংডু, বুথিডং ও পালেতোয়া নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ‘আরাকান আর্মি’। ওই এলাকার সাথে যোগাযোগ রাখার মতো রাষ্ট্রীয় কোনো শৃঙ্খলা এখন নেই। নেই আমলাতন্ত্রও। ওখানে চলছে বন্দুকের শাসন।
এ চরম অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে আমাদের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো নিয়েও। কক্সবাজার ও বান্দরবানে গড়ে উঠেছে ত্রিমুখী সশস্ত্র অক্ষ। গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে, বান্দরবান সীমান্ত থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের পাহাড়ের গহিনে ঘোঁট পাকাচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউপিডিএফ এবং কুকি-চিন। এদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে আরাকান আর্মি। চলছে সামরিক প্রশিক্ষণ। তার ওপর যুক্ত হয়েছে সশস্ত্র সংগঠন ‘কেএনসিপি’ ও ‘কেএনপি’। এরা সীমান্ত অতিক্রমের অপচেষ্টায় লিপ্ত। অন্যদিকে আশ্রয়শিবিরে থেকে জোর করে তুলে নেয়া হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। সীমান্তের ওই পারে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে তাদের। ক্যাম্পগুলোতে নতুন নতুন ভারী অস্ত্রের চালান ঢোকানোর খবরও আসছে।
আরাকান আর্মি বাংলাদেশী জেলেদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করছে বলেও খবর আসছে। এমনকি সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিজেদের এলাকা দাবি করে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর দুঃসাহসও দেখাচ্ছে। নাফ নদীতে বিজিবির কড়া নজরদারি আছে, সত্য। এ নজরদারির কারণে এখন ইয়াবা ও ভয়ঙ্কর ‘ক্রিস্টাল মেথ’-এর ৮০ শতাংশ আসছে মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও বাঁশখালীর গভীর সমুদ্রপথ ব্যবহার করে। এ জটিল এবং ত্রিমুখী পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতি অবশ্যই থাকতে হবে। এর জন্য সেনাবাহিনীর সাথে যোগ করা যেতে পারে ১৮ কোটি মানুষের সাহসিকতা ও দেশপ্রেম। চব্বিশে আমাদের সাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছেন আবু সাঈদ। বুলেটের মুখে বুক পেতে দিয়েছিলেন তিনি। কিছু দিন আগেও সীমান্তে সাহসিকতার প্রমাণ রেখেছেন বাংলাদেশের মানুষ। বিজিবি জওয়ানদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সীমান্ত আগলে রেখেছেন তারা। দেখা গেছে বৃদ্ধদের। সীমান্তে দাঁড়িয়েছেন তরুণরা। আমাদের মোট জনসংখ্যার বিশাল অংশ তরুণ। এদের এখন ‘যুদ্ধে যাওয়ার’ সময়। যুদ্ধ কেবল মাঠে হয় না। যুদ্ধ হয় সাইবার স্পেসেও। আইটিতে দক্ষ এমন লোক আমাদের কমতি নেই। তাদের সংগঠিত করে ‘জাতীয় সাইবার ব্রিগেড’ গড়ে তুলতে পারলে প্রতিরক্ষায় আরো এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এ ব্রিগেড শত্রুপক্ষের সাইবার হামলা থেকে দেশের ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও আইটি পরিকাঠামো রক্ষা করবে। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে।
আমাদের যতটুকু প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রয়োজন, ততটুকু অর্জন করতে হবে। এর মানে আমরা কারো সাথে শত্রুতা চাই না। আমাদের আকাশ, পানি ও স্থলকে বৈরীদের জন্য দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে নিজেদেরই। এতে যেকোনো কূটনৈতিক আলোচনায় এগিয়ে থাকতে পারব আমরা। পোক্ত প্রতিরক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে যে কূটনীতি হয়, বিশ্ব কেবল তাকেই সম্মান জানায়। যার বল থাকে, তার দলও হয়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত