বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একই সময়ে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ পরস্পরকে প্রভাবিত করছে— উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ। প্রতিটি সমস্যাই উদ্বেগের; কিন্তু যখন তিনটি সমস্যা একসাথে সক্রিয় থাকে, তখন তা কেবল প্রবৃদ্ধিকে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি বহাল রেখেছে, ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং সরকার বিনিয়োগে গতি ফেরানোর নানা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে; কিন্তু মূল প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে— পরিসংখ্যানের উন্নতি কি মানুষের জীবনে বাস্তব স্বস্তি এনে দিতে পারছে?
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা বোঝার জন্য প্রথমেই মূল্যস্ফীতির দিকে তাকাতে হয়, জুলাই, ২০২৬-এর গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশ। কয়েক বছর ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেট ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে। বাজারে গিয়ে একজন ভোক্তা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা অনেকসময় সরকারি মূল্যস্ফীতির গড় সংখ্যার সাথে মেলে না। কারণ পরিসংখ্যান একটি গড় হিসাব দেখায়; কিন্তু পরিবারের খরচের কাঠামো ভিন্ন হওয়ায় বাস্তব চাপ অনেক বেশি অনুভূত হয়।
অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা যায় ক্রয়ক্ষমতার ক্ষয়। যখন আয়ের বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হয়, তখন মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। অনেক পরিবার এখন সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাচ্ছে। কেউ খাদ্যতালিকা কাটছাঁট করছে, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে, আবার কেউ সন্তানের শিক্ষা ব্যয় পুনর্বিবেচনা করছে। এসব পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়; দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা আমাদেরকে একটি পুষ্টিহীন ও অদক্ষ জাতিতে পরিণত করবে।
মূল্যস্ফীতির পেছনে একাধিক কারণ বিদ্যমান। বৈশ্বিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দামের অস্থিরতা, টাকার বিনিময় হারের চাপ, আমদানিনির্ভর শিল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা— সবমিলিয়ে বাজারে মূল্যচাপ তৈরি হয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ চেইনের দক্ষতা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে এবং কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রেখেছে। একই সাথে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও কমানো হয়েছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। কারণ ঋণের চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি হলো— অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি কমানো; কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। উচ্চ সুদের পরিবেশে নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে অনীহা দেখান, আর ব্যবসায়ীরাও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হন।
অর্থনীতির দ্বিতীয় বড় উদ্বেগের জায়গা ব্যাংক খাত। ব্যাংক হলো অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার মতো। আমানত সংগ্রহ করে সেই অর্থ উৎপাদন, ব্যবসা ও বিনিয়োগে পৌঁছে দেয়াই এর মূল কাজ; কিন্তু যখন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, মূলধনের ঘাটতি এবং সুশাসনের সঙ্কট তৈরি হয়, তখন পুরো অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ব্যাংক খাতের আর্থিক দুরবস্থার প্রভাব বিভিন্ন আর্থিক সূচকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে এবং অনেক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। কয়েকটি ব্যাংক ভালো মুনাফা করলেও তা ধোপে টেকেনি। প্রথমবারের মতো পুরো খাতে বড় লোকসান হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫-এর তথ্য মতে, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের নিট লোকসান এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। এর মানে আমানতকারীদের যে পরিমাণ সুদ দেয়া হয়েছে, সে তুলনায় ঋণ থেকে আয়ের পরিমাণ কম হয়েছে। আগের বছর ২৯ হাজার ৩৯১ কোটি টাকার নিট সুদ আয় হয়েছিল। অবশ্য সুদবহির্ভূত আয় ২০২৪ সালের ৬৩ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকা হয়েছে। গত বছর বেতনভাতাসহ পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৫১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছর ৪৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ছিল। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের কর-পূর্ববর্তী লোকসান ছিল এক লাখ ২৪ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। আর নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে খেলাপি ঋণ কমাতে ১৮ মাসের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা বাড়ানো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন এবং ব্যাংক খাতে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানানো হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, নীতিমালা প্রণয়নের চেয়ে তার বাস্তব প্রয়োগই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংক-সঙ্কটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বিনিয়োগের ওপর। বিনিয়োগকারীরা শুধু সুদের হার দেখেন না; তারা নীতিগত স্থিতিশীলতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা এবং ভবিষ্যৎ বাজারের সম্ভাবনাও বিবেচনা করেন। বর্তমানে অনেক উদ্যোক্তা উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, জ্বালানি-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং বাজারের চাহিদার দুর্বলতার কারণে নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমছে, যা বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশের আরেকটি কাঠামোগত দুর্বলতা হলো রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা। রাজস্ব আদায়ও কম। অনেক মানুষ আয়কর দেন না। অতিরিক্ত কর অব্যাহতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে রাজস্ব আদায় কঠিন হয়েছে। দেশের কর-জিডিপির অনুপাত মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ, যা এখনো আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম। ফলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, করব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং অপ্রয়োজনীয় করছাড় পুনর্বিবেচনা করলে রাজস্ব বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির সময় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা বাড়াতে কাজে লাগতে পারে।
তবে এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ ৩৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক রেমিট্যান্স পেয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭.৩০ শতাংশ বেড়েছে। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগের তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭.৪৬ বিলিয়ন ডলার, আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এগুলো বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এবং আমদানি ব্যয় সামাল দিতে সহায়ক হতে পারে; কিন্তু এই ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখতে হলে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রফতানি বৈচিত্র্যকরণ জরুরি।
কৃষি খাতকেও নতুন করে গুরুত্ব দেয়ার সময় এসেছে। বর্তমানে দেশের প্রবৃদ্ধিতে সেবা খাতের অবদান বেশি হলেও কৃষি এখনো খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন, আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজারসংযোগ উন্নত করা গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারবেন। একই সাথে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়ানো গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
সবশেষে, একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি, অর্থনীতির সফলতা কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে বাজার করতে পারে, উদ্যোক্তা আস্থার সাথে বিনিয়োগ করতে পারে, ব্যাংকে আমানত রাখলে নিরাপত্তা অনুভব করে এবং তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং রাজস্ব সংস্কার— এই চারটি ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলা করবে না; বরং আগামী দশকের জন্য আরো টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও গড়ে তুলতে পারবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক