ড. এম শাহেদুল ইসলাম
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে আপাতবিরোধী বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট এবং চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে হলেও ব্যাপক লোডশেডিং নৈমিত্তিক ঘটনা। প্রশ্ন হচ্ছে— সক্ষমতা এত বেশি হলেও বিদ্যুৎসঙ্কট কেন?
এর মূল কারণ— স্থাপিত সক্ষমতা আর নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া এক বিষয় নয়। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা সবসময় পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দিতে পারে না। জ্বালানিসঙ্কট, যন্ত্রপাতির ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি সীমাবদ্ধতা, উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস এবং সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হতে পারে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দৈনিক প্রতিবেদনে এমন ব্যবধানের উদাহরণও দেখা যায়। ১০ জুন ২০২৬-এ সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট, বিপরীতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৭৯৬ দশমিক ৫১ মেগাওয়াট।
কাগজের সক্ষমতা নয়, প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত নির্ভরযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতার ওপর। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের আগে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলো কতটা কার্যকর, কত ঘণ্টা উৎপাদন করতে পারে এবং প্রয়োজনের সময় কতটা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে সেই মূল্যায়ন জরুরি।
যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কম সক্ষমতায় চলছে, সেগুলোর কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করতে হবে। একই সাথে কার্যকর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যেন প্রয়োজনের সময় জ্বালানির অভাবে বন্ধ না থাকে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ পরিকল্পনা করতে হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা শুধু কেন্দ্রের সংখ্যা বা মোট মেগাওয়াট দিয়ে নয়, নির্ভরযোগ্যতা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে করা প্রয়োজন।
সঙ্কটের কেন্দ্রে জ্বালানি
বিদ্যুৎ সঙ্কটের অন্যতম বড় কারণ জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা। গ্যাস, কয়লা বা তরল জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয় না। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনার সাথে জ্বালানি আমদানি, দেশীয় গ্যাসের ব্যবহার, মজুদ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে।
একই সাথে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ঝুঁকি কমাতে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ও জ্বালানি ঝুঁকি— দুটোই কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের ছাদেই লুকিয়ে আছে বড় সম্ভাবনা
বাংলাদেশে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে জমির সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা; কিন্তু দেশের শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনার বিশাল ছাদ এখনো কাজে লাগানো হয়নি।
সম্প্রতি অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেডের এক মূল্যায়নে শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনার ছাদে তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা চিহ্নিত হয়েছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আনুমানিক ১৬ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।
এটি শুধু পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ নয়; দিনের ব্যস্ত সময়ে শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যয়ও কমতে পারে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় পরিকল্পনার অংশ করতে হবে
এখন সময় এসেছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় বিদ্যুৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার। এ জন্য কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত জরুরি।
প্রথমত, বড় শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও নতুন শিল্পস্থাপনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত ছাদ থাকলে নির্দিষ্ট অংশে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য বাধ্যতামূলক বা প্রণোদনাভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, সহজ কিস্তি এবং কর-প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। অনেক প্রতিষ্ঠানের ছাদ থাকলেও প্রাথমিক বিনিয়োগের অভাবে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারছে না।
তৃতীয়ত, তৃতীয় পক্ষের বিনিয়োগভিত্তিক ব্যবস্থা আরো সহজ করা দরকার। অর্থাৎ কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ না করেও বিনিয়োগকারীর অর্থায়নে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারবে এবং চুক্তিভিত্তিক মূল্যে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক বিনিয়োগের চাপ কমবে।
চতুর্থত, নেট মিটারিং ব্যবস্থা আরো দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে। বর্তমান ব্যবস্থায় গ্রাহক নিজের উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করার পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিতরণ গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন এবং তা বিদ্যুৎ ব্যবহারের সাথে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।
শুধু সৌরবিদ্যুৎ নয়, প্রয়োজন সঞ্চালন ও সংরক্ষণ
তবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে সব সমস্যার একমাত্র সমাধান ভাবলে ভুল হবে। সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় বেশি উৎপাদিত হয়; কিন্তু বিদ্যুতের চাহিদা দিনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন থাকে। তাই ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুতের সাথে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে।
একই সাথে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। কোনো এলাকায় উৎপাদন বাড়লেও যদি বিদ্যুৎ বহন বা বিতরণের সক্ষমতা পর্যাপ্ত না থাকে, তাহলে সেই অতিরিক্ত উৎপাদন জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারবে না।
এখন প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত
বিদ্যুৎ খাত আরো কার্যকর করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন :
১. স্থাপিত সক্ষমতার পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতাকে বিদ্যুৎ পরিকল্পনার প্রধান সূচক করতে হবে।
২. জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর অর্থনৈতিক ও কারিগরি যাচাই করতে হবে।
৩. কম সক্ষমতায় চলা ও উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিয়মিত কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করতে হবে।
৪. শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সময়বদ্ধ জাতীয় কর্মসূচি নিতে হবে।
৫. নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন, সংযোগ ও হিসাব সমন্বয়ের প্রক্রিয়া আরো সহজ ও দ্রুত করতে হবে।
৬. স্বল্পসুদের অর্থায়ন এবং তৃতীয় পক্ষের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে।
৭. সৌরবিদ্যুতের সাথে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
৮. নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ সক্ষমতার ঘাটতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।
দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এসেছে
আমাদের এখন ভাবতে হবে কিভাবে বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়, কিভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং কিভাবে দেশের বিশাল অব্যবহৃত ছাদ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে এবং নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। এখন প্রয়োজন নীতির দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত কম অপচয়, বেশি নির্ভরযোগ্যতা, বহুমুখী জ্বালানি এবং বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদন ব্যবস্থা।
আমাদের শুধু বেশি বিদ্যুৎ নয়, সঠিক সময়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এ জন্য উল্লিখিত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনাকে দ্রুত কাজে লাগানোই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট