ইসলামে এমন অনেক বিধান রয়েছে যা ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক। জাকাত, উশর, সাদাকা এবং ফিতরা তার অন্যতম। বর্তমান বিশ্বে ধনী-গরিবের আনুপাতিক দূরত্ব প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশ্বের ৯০ শতাংশ সম্পদ ৫ শতাংশ মানুষের কুক্ষিগত। এটি মানবসভ্যতার জন্য চরম অশনি সঙ্কেত। মানুষের জন্য লজ্জার, হতাশাব্যঞ্জকও বটে।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সম্পদ দান করেন নানা ওসিলায়। আবার তিনি তা নিয়েও যান নানা কারণে। কাজেই সম্পদ নিয়ে ধনীদের অহঙ্কার করার কিছু নেই। ধনী যেন এটি মনে না করে যে, এ সম্পদ তাকে এককভাবে ভোগ করার জন্য দেয়া হয়েছে। বরং তার সম্পদের কিছু অংশ অন্যের।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তাদের (ধনীদের) সম্পদের মধ্যে সম্পদ প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের অংশ রয়েছে।’ (সূরা জারিয়াত-১৯) কাজেই গরিবকে তার অংশটুকু পৌঁছে দেয়া সম্পদশালীর দায়িত্ব। যত তাড়াতাড়ি গরিবের টাকা তাকে পৌঁছে দেয়া হবে তত তাড়াতাড়ি ধনীর সম্পদ নিরাপদ ও পবিত্র হবে।
রাসূল সা: বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা মুসলমান ধনী লোকদের ধন-সম্পদ থেকে এমন পরিমাণ ব্যয় করা ফরজ করে দিয়েছেন, যা গরিব ও ফকিরদের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হতে পারে। তাই, গরিব-দুঃখীরা যে ক্ষুধাকাতর কিংবা বস্ত্রহীন থেকে কষ্ট পায়, তার মূলে রয়েছে ধনী লোকদের পুঁজিবাদী আচরণ। এ বিষয়ে সব মুসলমানের উচিত সাবধান হওয়া। ধনীরা তাদের ধন-সম্পদ থেকে গরিব-দুঃখীদের নির্দিষ্ট প্রাপ্য অংশ দিয়ে দিলে গরিব-দুঃখীদের অভাব থাকতো না। মুসলিম মিল্লাতের ধনী লোকেরা এই বিশেষত্বটি যত বেশি উপলব্ধি করবে ততই মঙ্গল।
ফিতরা ও তার বিধি-বিধান
পবিত্র মাহে রমজানে সিয়াম পালন করতে গিয়ে সাধারণত আমাদের অনেক ভুলত্রুটি হয়ে যায়। সেই ত্রুটিবিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ইবাদতের নাম সাদাকাতুল ফিতর। দ্বিতীয়ত অসহায় মিসকিনদের জন্য ঈদের রিজিকের ব্যবস্থা করার জন্য, যাতে তারাও সবার সাথে আনন্দ উপভোগ করতে পারে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি উপহারও বটে। অসহায়, গরিব-মিসকিন যারা জাকাত পাওয়ার যোগ্য, তারাই ফিতরার হকদার। রাসূল সা: রোজা ফরজ হওয়ার বছরেই, জাকাত ফরজ হওয়ার আগে সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে জাকাতের মতো এ ক্ষেত্রে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরি নয়; বরং কেউ যদি ঈদের আগের দিনও নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাকেও ফিতরা আদায় করতে হবে।
নিজের এবং নিজের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান, এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক অধীনস্থ সন্তানদের জন্যও ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। কোনো এতিম শিশুর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে থাকলে তার পক্ষ থেকেও আদায় করা ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ সা: স্বীয় উম্মতের ক্রীতদাস ও স্বাধীন, নারী ও পুরুষ, ছোট ও বড় সবার ওপর ফিতরা ওয়াজিব করেছেন এবং তা ঈদের দিন ঈদগাহের উদ্দেশে বের হওয়ার আগেই আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি, ঈদের দিন সকালে কোনো শিশু ভূমিষ্ঠ হলে তার পক্ষ থেকেও ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।
ফিতরার হিসাব পদ্ধতি
ফিতরার নিসাব জাকাতের মতোই, অর্থাৎ ঈদের দিন সকালে নিজের একান্ত অত্যাবশ্যকীয় আসবাব সামগ্রী, ব্যবহার্য দ্রব্যাদি, থাকার ঘর ইত্যাদি বাদ দিয়ে যদি কোনো ব্যক্তির কাছে সাড়ে ৫২ তোলা রূপা অথবা সাড়ে সাত তোলা সোনা থাকে তাহলে ফিতরা আদায় করা ওই ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব। আবার কারো কাছে সোনা ও রুপা মিলে যেকোনো একটির নিসাব পরিমাণ টাকা থাকে তবে তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর দেয়া আবশ্যক।
ফিতরা দেয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের কয়েকজনের সদকা মিলিয়ে একজন গরিবকে একসাথে দেয়া যেতে পারে; অথবা একজনের সদকা কয়েকজন গরিবকেও দেয়া যেতে পারে। তবে উত্তম হলো, একজন গরিবকে এই পরিমাণ ফিতরা দেয়া, যা দিয়ে সে তার ছোটখাটো প্রয়োজন পূরণ করতে পারে কিংবা দু’বেলা খেতে পারে। ঈদুল ফিতরের দিন সকালে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম।
ধনীর ফিতরা গরিবের ঈদ
ঈদুল ফিতর ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দুটো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি। এক মাস কঠোর কৃচ্ছ্র সাধনের পর আসে ঈদ, যা রোজাদারদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অনন্য। রাসূল সা:-এর মদিনাতে হিজরতের অব্যবহিত পর থেকেই মুসলমানরা এ ঈদ উদযাপন করে আসছে। ঈদুল আজহা মূলত সামর্থ্যবানদের ঈদ হলেও ঈদুল ফিতর ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু এবং সাদা-কালো সবাই সব ভেদাভেদ ভুলে উদযাপন করে। রমজান মাসে রোজা পালনের পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ ঈদের আনন্দ দিয়েছেন সবার জন্য। তবে গরিব মানুষদের সামর্থ্যরে অভাবে প্রকৃত আনন্দে শরিক হতে পারে না। সে ক্ষেত্রে সামর্থ্যবানদের প্রদেয় ফিতরাই পারে গরিবদের ঈদের আনন্দে শরিক করতে। গরিব মানুষগুলো এই সমাজেরই মানুষ। তারা সারা বছরই দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে থাকে। তারা কমপক্ষে ঈদের দিন যাতে আনন্দে সবার সাথে শরিক হতে পারে, এ জন্য তাদের কিছু খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করে দেয়া উচিত।
ফিতরা ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে দেয়া উচিত যেন ঈদের দিন মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘোরা থেকে গরিবরা বাঁচতে পারে। সমাজে বসবাসকারী ধনিক শ্রেণীর মানুষদের সাথে গরিবরাও যাতে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। ফিতরার মাধ্যমে মুসলিম সমাজে বসবাসকারী ধনীদের অর্থ গরিবদের মধ্যে বণ্টিত হয় এবং এর দ্বারা তাদের জীবনযাপনে কিছুটা হলেও গতি সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে সমাজের মানুষের মধ্যে সমতা আসে এবং সহযোগিতার বিস্তার ঘটে।
নগদ অর্থ দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। রাসূল সা: পণ্য দিয়ে ফিতরা দিয়েছেন; অথচ ওই যুগেও মুদ্রা হিসেবে দিরহাম প্রচলিত ছিল। দিরহাম দিয়ে কেনাকাটা, দানখয়রাত করা হতো। ইমাম শাফেয়ি, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ রহ. এবং সৌদি আরবের খ্যাতনামা আলেমদের মতে নগদ অর্থ দেয়া বৈধ হবে না। কেননা, হাদিসে নগদ অর্থের উল্লেখ নেই। তবে, ইমাম আবু হানিফা ও তার অনুসারীদের মতে, নগদ অর্থ দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে। কেননা, দরিদ্র মানুষের যেমন প্রয়োজন খাদ্যের, তেমনি প্রয়োজন কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য সামগ্রীর। সবাই যদি শুধু খাদ্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে তাহলে তার কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য সামগ্রী কেনার জন্য তাকে পণ্য বিক্রি করতে হবে। এতে যেমন রয়েছে বিড়ম্বনা, তেমনি বিক্রি করতে হবে তুলনামূলকভাবে কম মূল্যে। এতে হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র মানুষটি। অতএব ইমাম আবু হানিফার মতে, এ ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতায় না গিয়ে বিষয়টি উন্মুক্ত রাখাই উত্তম, যাতে সবার জন্যই তা সহজ হয়ে যায়।
ফিতরা রোজাদারের রোজার কাফফারা। সুতরাং এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। একজন মুসলমানের মুখে হাসি ফুটানো উত্তম সদকা। আর মাত্র ক’দিন পর ঈদ। গরিব-অসহায়দের ঈদ আনন্দে শরিক করে তাদের মুখে হাসি ফোটানো সব মুসলমানের দায়িত্ব।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট