ইতিহাসে এমন কিছু দিন রয়েছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়ে থাকে না; বরং একটি জাতির দীর্ঘ যাত্রাপথ, তার সাফল্য ও ব্যর্থতা, আশা ও হতাশা, উত্থান ও পতনের প্রতীকী বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়। ২৩ জুন তেমনই একটি দিন। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় ১৭৫৭ সালের পলাশীর আম্রকাননের সেই বেদনাবিধুর অধ্যায়, যেখানে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা, নবাবী দরবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং লর্ড ক্লাইভের কূটকৌশলের ফলে নবাব সিরাজউদদৌলার পরাজয় ঘটে এবং বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়।

ঠিক একই দিনে, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে জন্ম নিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে দলটি আওয়ামী লীগে রূপান্তরিত হয় এবং পাকিস্তানি শাসন, বৈষম্য ও কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে বাঙালির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রধান বাহকে পরিণত হয়। ফলে ২৩ জুন এক দিকে যেমন অধীনতার স্মারক, অন্য দিকে তেমনি মুক্তির আকাক্সক্ষা, রাজনৈতিক জাগরণ ও সংগ্রামেরও প্রতীক।

রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর নির্মম শিক্ষা হলো, কোনো রাজনৈতিক শক্তি, মতাদর্শ কিংবা শাসনব্যবস্থা চিরকাল একই চরিত্র ও অবস্থানে স্থির থাকে না। ইতিহাসের গতিশীলতা এবং ক্ষমতার অন্তর্নিহিত প্রকৃতি এমন যে, যারা একসময় নিপীড়ন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের পতাকা বহন করে, তারাই উৎপীড়ক হয়ে ওঠে, যার বিরুদ্ধে আবারো জনগণের মধ্যে নতুন মুক্তির আকাক্সক্ষা জন্ম নেয়। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাই ২৩ জুনকে আজ নতুন এক রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক তাৎপর্যে অভিষিক্ত করেছে। একটি ২৩ জুন ছিল অধীনতার সূচনা, আরেকটি ছিল রাজনৈতিক জাগরণের জন্মমুহূর্ত; আবার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে আরেকটি ২৩ জুন হয়ে উঠেছে ক্ষমতার অনিবার্য উত্থান-পতনের স্মারক।

পলাশীর পরাজয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তা ছিল শাসকগোষ্ঠীর জনবিচ্ছিন্নতা, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্মিলিত ফলাফল। বাহ্যিক শক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, কোনো রাষ্ট্রের পতনের প্রধান কারণ প্রায়ই তার অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আধুনিক বিশ্লেষণও এই সত্য সমর্থন করে। যখন শাসক ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে, যখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং যখন ক্ষমতার উৎস হিসেবে জনগণের পরিবর্তে বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়, তখন রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইতিহাসের বাস্তবতা হলো, কোনো রাজনৈতিক শক্তির অতীতের গৌরব তাকে ভবিষ্যতের সমালোচনা থেকে অব্যাহতি দেয় না। ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী ভিলফ্রেডো প্যারেটো তার ‘এলিট সার্কুলেশন’ বা অভিজাতদের চক্রাবর্তন তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, যারা একসময় বিদ্যমান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ক্ষমতায় আসে, সময়ের প্রবাহে তারাই নতুন অভিজাত শ্রেণীতে পরিণত হয়। নতুন শাসকগোষ্ঠী ধীরে ধীরে সেই বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করতে শুরু করে, যেগুলোর বিরুদ্ধে তারা একসময় লড়াই করেছিল। রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু অধ্যায়ে এই তত্ত্বের প্রতিফলন দেখা যায় এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও অনেক বিশ্লেষকের কাছে সেই আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশেষত ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এক নতুন মাত্রা লাভ করে। এ সময়ে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার এবং যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়নের মতো বেশ কিছু সাফল্য অর্জিত হয়। অপর দিকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়, নির্বাচনব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক বাড়ে, প্রশাসন ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তথাকথিত উন্নয়নের গণতন্ত্রের লেবাসে প্রকৃত গণতন্ত্রের অবসান ঘটে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ তত্ত্ব অনুসারে, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না; বরং নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপরও নির্ভরশীল। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা দলের প্রভাবমুক্ত থেকে নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হতে ব্যর্থ হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় দেখা দেয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেক গবেষক এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে পরিস্থিতি মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন।

এ সময় ২৩ জুনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক প্রতীকী অর্থ ধারণ করে। একসময় যে দিনটি ছিল সংগ্রামের স্মারক, তা ক্রমে ক্ষমতার প্রদর্শনের দিনে পরিণত হয়। বিশাল শোভাযাত্রা, বর্ণাঢ্য আয়োজন, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং দলীয় শক্তির প্রকাশ্য প্রদর্শন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। দলের আত্মসমালোচনা বা আত্মমূল্যায়নের কোনো বালাই ছিল না। ২০২৬ সালের ২৩ জুন সামনে রেখে তর্জনগর্জন করেছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। জনগণের নীরব প্রতিবাদে এবং সরকারের সরব প্রতিরোধে তা ভেস্তে গেছে।

গ্রিক রাজনৈতিক দর্শনে ‘হিব্রিস’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে। এর অর্থ এমন এক অতি-আত্মবিশ্বাস বা অহঙ্কার, যা মানুষকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইতিহাসে বহু শাসক, সাম্রাজ্য ও রাজনৈতিক শক্তির পতনের পেছনে এই হিব্রিসকে দায়ী করা হয়েছে। ক্ষমতা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তার ওপর কার্যকর জবাবদিহি অনুপস্থিত থাকে, তখন শাসকগোষ্ঠী অনেকসময় নিজেদের অপরাজেয় ভাবতে শুরু করে। চার পাশে তোষামোদকারী ও সুবিধাভোগীদের বলয় তৈরি হয়, যা প্রকৃত জনমতকে আড়াল করে রাখে। জনগণের ক্ষোভ, তরুণদের হতাশা, অর্থনৈতিক বৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক বঞ্চনার সঙ্কেতগুলো তখন আর ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছায় না।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সূচিত ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলন দ্রুত এক বৃহত্তর রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। বহু বছরের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জনমানসের ক্ষোভ অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে দীর্ঘদিন স্থিতিশীল বলে মনে হওয়া রাজনৈতিক কাঠামো হঠাৎ করেই ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও সেই ঐতিহাসিক ধারার সাথে তুলনীয়। ২০২৬ সালে আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন এক পরিস্থিতিতে পালিত হয়েছে, যখন তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তাদের প্রায় সব নেতা আজ পলাতক অথবা কারাগারে।

ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশো বলেছিলেন, বৈধ রাজনৈতিক কর্তৃত্বের উৎস হলো জনগণের সম্মতি। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জনগণের ইচ্ছা, অংশগ্রহণ ও সম্মতির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রশাসনিক শক্তি, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা সাময়িকভাবে কোনো শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক শক্তি স্থায়ী বৈধতা অর্জন করতে পারে না।

প্রকৃত স্বাধীনতা হলো নাগরিকের মর্যাদা, মতপ্রকাশের অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির নিশ্চয়তা। কোনো রাষ্ট্রকে তখনই সত্যিকার স্বাধীন বলা যায়, যখন তার জনগণ নির্ভয়ে কথা বলতে পারে, ভোট দিতে পারে, সংগঠিত হতে পারে এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অংশ নিতে পারে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক দল, ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে নিরাপদ নয়। এই দেশের স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অবাধ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, পেশাদার প্রশাসন এবং নাগরিক অধিকারের কার্যকর সুরক্ষা। রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তাহলেই কেবল একটি টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠা সম্ভব।

এই কারণেই ২৩ জুন ইতিহাসের আয়নায় প্রতিফলিত একটি গভীর রাজনৈতিক শিক্ষা। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন যদি অধীনতার সূচনা হয়ে থাকে, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যদি রাজনৈতিক জাগরণের ভিত্তি রচনা করে থাকে, তবে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের ২৩ জুন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং ইতিহাসের অনিবার্য বিচার সম্পর্কে এক নতুন স্বাধীনতার স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জনগণ যখন বিশ্বাস করে, তখন তারা একজন নেতা, একটি দল কিংবা একটি আন্দোলনকে অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। আবার যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতার কাঠামোও মুহূর্তের মধ্যে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সেই কারণেই ২৩ জুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অধীনতা ও স্বাধীনতা, উত্থান ও পতন, সংগ্রাম ও আত্মসমালোচনা, ক্ষমতা ও জনগণের সম্পর্কের এক অনন্য প্রতীক। এই তারিখ আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি, কোনো দল, কোনো মতাদর্শ কিংবা কোনো শাসক কখনোই স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে পারে না।

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Mal55ju@yahoo.com