যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে থেকেই, বিশেষ করে ৪০ দিনের প্রত্যক্ষ যুদ্ধে ইরানের সফল প্রতিরোধ ও নিখুঁত নিশানায় শত্রুর ওপর আঘাত হানার পারঙ্গমতা দেখে ভূরাজনীতির অনেক বিশ্লেষক বলতে শুরু করেন, ইরান শিগগিরই আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে উঠবে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, আর তা হয়েছে ইরানেরই শর্তে। ইরানের সব দাবি মেনে নিয়ে সমঝোতাস্মারক স্বাক্ষর করেছে আমেরিকা। এখন চলছে ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা। অগ্রগতিও হচ্ছে। তবে, যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আঞ্চলিক নয়, ইরান বৈশ্বিক পরাশক্তি হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়ার সাথে একই কাতারে উঠে আসবে দেশটি। একজন বিশ্বসেরা বিশ্লেষক একেবারে সময় বেঁধে দিয়ে বলেছেন, চতুর্থ পরাশক্তি হতে দেশটির সময় লাগবে মাত্র ১৮ মাস। হ্যাঁ, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রাবার্ট পেপ এই সময়ই দিয়েছেন।
কিভাবে ইরান বৈশ্বিক পরাশক্তি হবে
পরাশক্তি হওয়ার জন্য কোনো দেশের দরকার হয় সামান্য কয়েকটি জিনিস। এগুলো একধরনের পূর্বশর্ত। বিশাল ভূখণ্ড ও বৃহৎ জনশক্তি ইরানের আছে। এর সাথে দরকার :
১. সমর শক্তি। না, আমেরিকা, চীন ও রাশিয়ার মতো সামরিক শক্তি ইরানের নেই। নেই বিশাল নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী। সেনাবাহিনী সেকেলে অস্ত্রে সজ্জিত। এ জন্যই ইরান যুদ্ধে অপ্রতিসম রণকৌশল নেয়, যেটিকে বলা হচ্ছে অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধকৌশল। আর এ কৌশলে দেশটি যে সফল হয়েছে সে তো প্রমাণিত। শুধু টিকে থাকেনি, বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তিকে নাস্তানাবুদ করেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে বিশ্ব তেল বাণিজ্য থামিয়ে দিতে পেরেছে। বাব আল মান্দাব প্রণালী বন্ধের ক্ষমতাও তার আছে, ইয়েমেনের হুতি মিত্রদের দিয়ে। দুই প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের ৫০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যাবে। এমন হলে বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতির কী মহাবিপর্যয় হবে তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। গোটা বিশ্বকে জিম্মি করতে পারলে অত্যাধুনিক সশস্ত্রবাহিনীর আদৌ দরকার আছে কি? আবার অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, পরমাণু বোমাও ইরান বানিয়ে ফেলবে। প্রফেসর রবার্ট পেপ দৃঢ় আস্থার সাথে বলেছেন, সমঝোতাপত্রে যা-ই লেখা থাকুক, এখন থেকে পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে ইরান পরমাণু বোমার অধিকারী হবে।

২. অর্থনৈতিক শক্তি। দীর্ঘ ৪৭ বছরের অবরোধ নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। যুদ্ধের আগেই মুদ্রার অবিশ্বাস্য দরপতন ঘটে, মূল্যস্ফীতি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। বোঝা যায়, ইরানের ৯ কোটি মানুষের ওপর কী নির্মম দুর্ভোগ চাপিয়ে দিয়েছে পাশ্চাত্য। শুধু এই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়েই বিচার হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রসহ সব পশ্চিমা দেশের নেতাদের। আশার কথা, যুদ্ধ শেষের সাথে সাথে ইরানে অর্থের ঢল শুরু হয়েছে। পুনর্গঠনের নামে ৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ। ফ্রিজ করা ২৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১২ বিলিয়ন এখনই মুক্ত হচ্ছে। পাশাপাশি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তার আগেই গত ২০ জুন ২০২৬ ইরান এক দিনে ১৪৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রফতানি করছে। এক দিনে এত বিপুল তেল এর আগে আর কোনো দেশ রফতানি করেনি। এই তেল বিক্রি থেকে দেশটি এক দিনে পাচ্ছে ১৩ বিলিয়ন ডলার। আর এখন থেকে প্রতিদিন তেলের টাকা আসতেই থাকবে।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, অনেক দেশ টাকা হাতে নিয়ে অবিরাম ফোন করছে, এক্ষুনি তেল পাঠান। খোদ আমেরিকাও এখন নগদ টাকায় ইরানের তেল কিনবে। আসলে সে তো তেল লুটতেই এসেছিল। নেতানিয়াহুর উসকানির যত কথাই বলা হোক।
তো আমেরিকা কেন ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ করে সমঝোতায় গেল? সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বেফাঁস কথায় আসল সত্য ফাঁস করে দিয়েছেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পই। ফ্রান্সে জি-সেভেন শীর্ষ সম্মেলনে গিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে তার দেশের তেলের মজুদ শেষ হয়ে যেত। মাত্র চার সপ্তাহ, মানে এক মাসের তেল আছে মহাশক্তির দেশ আমেরিকার কাছে। প্রতিদিনের বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধব্যয় তো আছেই। ১৯৫৩ সালের পর এটিই আমেরিকার সর্বনিম্ন তেলের মজুদ। এ অবস্থার কারণও আবার ট্রাম্প নিজেই। যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে তিনি মজুদ থেকে বাজারে তেল ছেড়েছেন, যাতে কৃত্রিমভাবে তেলের দাম কমিয়ে রাখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প তেল না ছাড়লে দাম ব্যারেল-প্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারত। তাই সমঝোতা ছাড়া ট্রাম্পের হাতে বিকল্প ছিল না।
ট্রাম্প আরো বলেছেন, সমঝোতায় না পৌঁছালে অর্থাৎ- যুদ্ধ আরো কিছু দিন চললে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক ধস নামত। একেবারে সেই ১৯৩০-এর মহামন্দার মতো।
যাই হোক, ইরানের অর্থপ্রবাহের আরেক উৎস হবে অস্ত্র।
দেশটি সমরাস্ত্রের অর্ডারও পেতে শুরু করবে যেকোনো সময়। যে ড্রোন ও মিসাইল প্যাট্রিয়ট, থাড, আয়রন ডোম, অ্যারো-২ ও ৩, ডেভিডস স্লিং, সি-ডোম এবং লেজার-ভিত্তিক ‘আয়রন বিম’-এর মতো সব ঢাল ভেদ করে নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানতে পারে, সারা বিশ্বে তার চাহিদা বাড়বেই। আগেও ইরান ড্রোন বিক্রি করেছে পরাশক্তি রাশিয়ার কাছে।
এ ছাড়া আগামী ৬০ দিন পরই ইরানের স্থায়ী আয়ের উৎস হবে হরমুজ প্রণালী। জাহাজ থেকে অর্থ আদায়, সেটি টোল হোক বা সার্ভিস ফি, কী এসে যায়?
৪৭ বছর পর আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের আরোপিত শত শত নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ উঠে গেলে, ইরান যখন বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বীমা ও বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলে যুক্ত হবে তখন তো মনে হয় ইরানকে টেক্কা দেয়ার কেউ থাকবে না।
৩. বৈশ্বিক প্রভাব। পরাশক্তি হতে হলে অবশ্যই সারা বিশ্বে প্রভাব থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে- ৪৭ বছর ধরে আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে ইরানকে একঘরে করে রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ বিনা কারণে। তারপরও ইরান কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ, অর্থাৎ- আঞ্চলিক পরাশক্তি। বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক বা সামরিক আধিপত্য না থাকলেও বর্তমান যুদ্ধে দেশটি গোটা বিশ্বে যে সমীহ অর্জন করেছে, সেটির গুরুত্ব সীমাহীন। এটি পরোক্ষ প্রভাব হিসেবে কাজ করবে।
শিক্ষা গবেষণা প্রযুক্তিতে ইরান বিশ্বের কারো চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান চিকিৎসা প্রকৌশল ইত্যাদি খাতে শুরু ইরানি নারীদেরই অংশগ্রহণ ৭০ শতাংশ। এমনকি জেট ইঞ্জিন তৈরির সক্ষমতায়ও দেশটির অবস্থান চতুর্থ। আমেরিকা রাশিয়া চীনের ঠিক পরেই। অবরোধ-নিষেধাজ্ঞামুক্ত হয়ে আর সব দেশের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারলে এই দেশকে ঠেকিয়ে রাখবে এমন শক্তি কার!
মোদ্দা কথা হলো এই যে, ইরান আর কেবল আঞ্চলিক শক্তি নয়- রীতিমতো গ্লোবাল সুপার পাওয়ার হতে যাচ্ছে। এটিও একরকম নিশ্চিত যে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার উপস্থিতি শিগগিরই শেষ হবে। না, এই বিষয়টি প্রচলিত ধারণার নিরিখে দেখলে বোঝা যাবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পেপ বা অন্যরা যখন বলেন, ইরান বৈশ্বিক পরাশক্তি হবে, তখন তারা মূলত পুরনো মানদণ্ড ব্যবহার করে না। তারা কথাটা বলেন, ইরানের এককভাবে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা এবং যেকোনো অপ্রতিরোধ্য চাপের মুখেও অটল থাকার শক্তি বা স্থিতিস্থাপক গুণের পরিপ্রেক্ষিতে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে রবার্ট পেপ স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘বিশ্বশক্তির চতুর্থ একটি কেন্দ্র দ্রুত আবির্ভূত হচ্ছে, সেটি ইরান’ যদিও দেশটি ‘অর্থনৈতিক বা সামরিকভাবে বর্তমান তিন পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।’
এ দিকে সাবেক মার্কিন কর্নেল ডগলাস ম্যাকগ্রেগর, যিনি এখন আন্তর্জাতিক বিষয়ে খ্যাতিমান ভাষ্যকার, মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তার সব বৈদেশিক সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে আসতে হবে। এটিই ইঙ্গিত যে, আমেরিকা আর পরাশক্তি থাকবে না। তবে ইরানের উত্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতন কত দিনে বা কত বছরে ঘটবে তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে।
শেষ কথা হলো- পাড়ার পুরনো মাস্তানকে যে পিটিয়ে শুইয়ে দিতে পারে, তাকেই সবাই সালাম ঠোকে। ইরান কাজটি ভালোভাবেই সেরেছে।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত