এ মাসের ১৮ এবং ১৯ তারিখে সিলেটে ছিলাম। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবসময়ই আমাকে আকর্ষণ করে। প্রকৃতিতে দেখা মেলে সৃষ্টির সুনিপুণ কারুকাজ। আমি যখনই সিলেটে এসেছি চেষ্টা করেছি জাফলং, সাদাপাথর বা বিছানাকান্দি যেতে। হৃদয়ের প্রশান্তির জন্য। রাতারগুলের মতো বিশ্বসেরা প্রাকৃতিক জলারণ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলার আনন্দই আলাদা। ভোলাগঞ্জ যাওয়ার পথে শহর থেকে কিছু দূরে রাস্তার পাশে পাখির বাড়ি। একটি বাড়িতে হাজার পাখির কাকলি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এবার দেখতে পেলাম না। তস্কররা রাতের আঁধারে পাখিদের ওপর হামলা করায় পাখিরা চলে গেছে।
১৯-২০ কিলোমিটার দীর্ঘ দেশের একমাত্র পাথর পরিবাহী রোপওয়েটি ভোলাগঞ্জেই। বিস্তৃতি ভোলাগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জের ছাতক পর্যন্ত। ১৯৬৪ সালে নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৭০ সালে কার্যক্রম শুরু। শুরুতে ভোলাগঞ্জ থেকে ঝুড়ি ভর্তি করে (প্রতি ঝুড়িতে ৬০০ কেজি) পাথর নেয়া হতো ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে। সে সময় স্থল ও জলপথের সীমিত সুবিধার জন্য পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে পাথর পরিবহনের জন্য এই রোপওয়ে নির্মাণ করে। রোপওয়েটি সিলেটের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়। মেঘালয়ের পাহাড়ের পাদদেশে (চেরাপুঞ্জির নিচে) এর অবস্থান এবং ঝরনা ও নদীর স্রোতে ভেসে আসা অসংখ্য সাদা পাথর এলাকাটিকে নৈসর্গিক আকর্ষণে পরিণত করেছে। রোপওয়ে ও সাদাপাথর এলাকার ঠিক উপরে মেঘালয়ের পাহাড়পুঞ্জের গায়ে মেঘের সমারোহ এবং মেঘের আড়াল থেকে পাহাড় চূড়ার লুকোচুরি প্রকৃতিপ্রেমী যেকোনো মানুষকে অভিভূত করে। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার কলতান, স্ফটিক স্বচ্ছ শীতল পানির স্রোতে গা ভাসানোর আহ্বান উপেক্ষা করা কঠিন। এখানে গেলেই চোখে পড়বে ঝরনার পানিতে নানা বয়সের মানুষের মাতামতি। ঝরনার উপরেই বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চৌকি। চৌকির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে পর্যটকদের অর্থায়নে নির্মিত একটি সুন্দর মসজিদ। রোপওয়ের প্রায় সাত শতাধিক লোহার খুঁটি (টাওয়ার) ও ধাতব তারের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় পাথর আনা-নেয়ার ব্যাপারটি কেবলকারের সাথে তুলনীয়। ২০১৪ সাল থেকে রোপওয়েটি পরিত্যক্ত। এর মধ্যে অনেক টাওয়ার বাল্কহেডের ধাক্কায় হেলে পড়েছে। পাথরখোরদের কাণ্ডজ্ঞান বিবর্জিতভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে অনেক টাওয়ারের ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে। লুট হয়ে গেছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি। বেদখল হয়েছে এর ৩০০ একর জমি। অবহেলা, খামখেয়ালির কারণে দেশের একমাত্র রজ্জুপথ আজ ধ্বংসের পথে। এখনো প্রতিদিন হাজার হাজার প্রকৃতিপ্রেমী প্রতিদিন ভিড় জমায় এখানে। এদের জন্য নেই কোনো বিশ্রামাগার। নেই মানসম্পন্ন খাবারের দোকান। অথচ পর্যটন কর্তৃপক্ষ একটু দৃষ্টি দিলেই এটি হয়ে উঠতে পারে কক্সবাজারের মতো জমজমাট পর্যটন স্পট।
শেষ ২০২২ সালে যখন আসি, হৃদয় জুড়িয়ে গিয়েছিল সাদা পাথরের সমারোহে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর স্থানীয় তস্কররা পুরো পাথর রাতারাতি তুলে বেচে দেয়। শোনা যায়, এতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে কিছু পাথর প্রত্যর্পণ করা হলেও একটুও সাদাপাথর ফেরত আসেনি। এই চক্রের কাউকে ধরা হয়নি, শাস্তি হয়নি। আইন এখানে পদে পদে ভূলুণ্ঠিত। প্রশ্ন জাগে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আদৌ অস্তিত্ব আছে কি?
মূল ভূখণ্ড থেকে ধলই নদী পেরিয়ে প্রায় ২০ মিনিটের দূরত্ব অতিক্রমের জন্য ইঞ্জিন লাগানো ছোট নৌকাই সম্বল। নদী পার হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক, বিশেষ করে বর্ষার সময়। এখানে পর্যটন বিভাগ ছোট স্টিমারের ব্যবস্থা করতে পারে। কেউ বিপদে পড়লে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার কোনো উপায়ও নেই। এসব ব্যবস্থা করলে ভোলাগঞ্জ হয়ে উঠতে পারে পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য।
এখানে ভ্রমণপিপাসুদের সবচেয়ে বড় বাধা শব্দদূষণ। রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য পাথর ভাঙার যন্ত্রের শব্দ এবং পাথর ভাঙার কারণে সৃষ্ট ধুলায় গোটা এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, যা বিরাট স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। এগুলোর কতটা বৈধ কেউ বলতে পারে না। পাথার ভাঙার কাজে জড়িতদের অনেকেই উচ্চপদস্থ, সমাজের অত্যন্ত নামকরা সম্মানিত ব্যক্তি। আইন তাদের স্পর্শ করতে ভয় পায়। মনে প্রশ্ন জাগে, এদের কাছে কি দেশের চেয়েও অর্থ উপার্জনই বড়?
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ