রাষ্ট্র প্রতি বছর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, ভিজিডি, খাদ্যসহায়তা ও বিভিন্ন নগদ সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেয়া হয়। বাস্তবে এসব কর্মসূচি সবসময় কাক্সিক্ষত ফল দেয় না। দুর্নীতি, অপচয়, সীমিত সম্পদের কারণে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে প্রশ্ন ওঠে, বিকল্প কোনো নৈতিক ও মানবিক কাঠামো কি সমাজে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এই প্রশ্নের একটি সুস্পষ্ট উত্তর রয়েছে ইসলামের জাকাত ব্যবস্থায়। জাকাত যেমন ধর্মীয় দায়িত্ব, তেমনই একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা। জাকাতকে ধনীদের সম্পদে দরিদ্রের অধিকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য সম্পদের সুষম বণ্টন, দারিদ্র্যবিমোচন, বৈষম্য হ্রাস এবং সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে জাকাত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অংশ হিসেবে কার্যকর ছিল এবং এর মাধ্যমে সমাজে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছিল।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাকাতকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় এনে দারিদ্র্যবিমোচনে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে জাকাত মূলত ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সাথে এর সমন্বয় এখনো দুর্বল। আধুনিক অর্থনীতিতে করব্যবস্থার মাধ্যমে যে পুনর্বণ্টন করা হয়, ইসলাম সেখানে জাকাতের মাধ্যমে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি যুক্ত করেছে। এর ফলে অর্থপ্রবাহ সক্রিয় হয়, বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে এবং অর্থনীতি গতিশীল হয়।
ইসলামী দৃষ্টিতে জাকাত কেবল আর্থিক সহায়তা নয়; মানুষের আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক দায়িত্ববোধেরও প্রতিফলন। সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কমিয়ে এটি সহমর্মিতা ও নৈতিকতা বৃদ্ধি করে। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রদান করে, যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত হলেও সামাজিক দায়বদ্ধতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জাকাত এই ভারসাম্যের বাস্তব রূপ।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে জাকাত সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ ছিল। খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে এই ব্যবস্থা আরো সুসংগঠিত হয়। জাকাত আদায়কে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। হজরত উমরের সময় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তালিকা তৈরি করে নিয়মিত সহায়তা দেয়া হতো, যা আধুনিক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সে সময় জাকাত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় তদারকি এবং নৈতিক মূল্যবোধের কারণে ধনিকশ্রেণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাকাত দিত এবং জনগণের আস্থা বজায় থাকত। আধুনিক বিশ্বে যেখানে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রকে বিপুল কর সংগ্রহ ও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, সেখানে জাকাত একটি স্বনির্ভর ও নৈতিক বিকল্প মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
আধুনিক বিশ্বে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও তার সুফল সব শ্রেণীর মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। ফলে সম্পদের কেন্দ্রীভবন বাড়ে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রেক্ষাপটে জাকাতকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং কার্যকর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ বিবেচনা করা যেতে পারে।
সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাত আদায় ও ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে, যেখানে জাকাত, ট্যাক্স ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এই কার্যক্রম পরিচালনা করে। সংগৃহীত অর্থ দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানে ১৯৮০ সালে জাকাত ও উশর অধ্যাদেশের মাধ্যমে ব্যাংক আমানতসহ নির্দিষ্ট সম্পদ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাকাত কেটে এই অর্থ রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। মালয়েশিয়ায় জাকাত ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর।
এখানে জাকাত শুধু তাৎক্ষণিক সাহায্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ব্যবহৃত হয়। ইন্দোনেশিয়ায় জাতীয় জাকাত সংস্থা BAZNAS জাকাত ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে এবং এটিকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) সাথে যুক্ত করা হয়েছে। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং World Zakat Forum জাকাতকে দারিদ্র্যবিমোচনের একটি সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে দেখছে।
বিভিন্ন গবেষণা ও অর্থনৈতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, যদি বাংলাদেশে বিদ্যমান সম্পদভিত্তিক জাকাত সঠিকভাবে সংগঠিত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার মাধ্যমে আদায় করা যায়, তবে বছরে প্রায় এক থেকে দেড় ট্রিলিয়ন টাকা পর্যন্ত জাকাত সংগ্রহ হতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রতি বছরের বাজেট ক্রমাগত বাড়ছে। মোট বাজেটের প্রায় ১৫-১৭ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ করা হয়, যা আনুমানিকভাবে ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন টাকার মধ্যে থাকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য প্রক্ষেপণ অনুযায়ী এই বরাদ্দ প্রায় ১ দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন টাকা হতে পারে। যদিও এটি সরকারি নীতি ও রাজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
জাকাত এবং আধুনিক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে গভীর দার্শনিক ও অর্থনৈতিক মিল রয়েছে। উভয় ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য সমাজের দরিদ্র, বঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস। তবে জাকাত ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভরশীল, আর আধুনিক সোস্যাল সেফটি নেট মূলত রাষ্ট্রীয় করব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর চাপ ক্রমবর্ধমান, সেখানে জাকাত গুরুত্বপূর্ণ সম্পূরক উৎস হতে পারে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে জাকাত ব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে একটি দ্বৈত নিরাপত্তাকাঠামো তৈরি করা সম্ভব, যেখানে এক দিকে থাকবে করভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, অন্য দিকে জাকাত ব্যবস্থা।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। বর্তমান জাকাত ব্যবস্থা মূলত বিকেন্দ্রীভূত এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিচালিত হয়। এটিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে যুক্ত করতে হলে একটি কেন্দ্রীয় নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন, যা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নও উত্থাপন করতে পারে। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শরিয়াহভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাকাত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে যুক্ত হলে এটি স্বেচ্ছামূলক থাকবে নাকি বাধ্যতামূলক হবে- এই প্রশ্ন নীতিগতভাবে সংবেদনশীল। একটি জাতীয় ডিজিটাল জাকাত প্ল্যাটফর্ম এবং ডাটাবেস তৈরি করা গেলে জাকাত সংগ্রহ, বিতরণ এবং পর্যবেক্ষণ অনেক বেশি স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
নিয়মিত অডিট ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা থাকলে আস্থা বাড়বে এবং দুর্নীতির ঝুঁকি কমবে। একই সাথে নীতিনির্ধারক, আলেম সমাজ ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সমন্বিত সংলাপ প্রয়োজন হবে, যাতে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি একত্রে কাজ করতে পারে।
জাকাত রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং একটি সম্পূরক নৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো। সঠিকভাবে সংগঠিত করা সম্ভব হলে জাকাত বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিমোচন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ গবেষক ও কলামিস্ট