ভারতের সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর, বিশেষত বাংলাদেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের যে অস্বস্তি ছিল, ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তা এখন জনরোষে রূপ নিয়েছে। কেন অনেক বাংলাদেশী এমন অনুভব করছেন তা বুঝতে হলে নয়াদিল্লির আচরণের সেই ধরনটি দেখা দরকার, যাকে সমালোচকরা ছোট প্রতিবেশীদের প্রতি ‘বড় ভাই’ বা আধিপত্যবাদী মনোভাবের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। শুরুটা হাসিনাকে দিয়েই। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রায় নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে গেছে, এমনকি যখন সেই সরকার ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছিল, বিরোধী দলকে দমন করছিল এবং নির্বাচন কারচুপির অভিযোগ উঠছিল। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান। তখন থেকেই সেখানে অবস্থান করছেন, আর নয়াদিল্লি ঢাকার প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। এই একটি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মানুষের ভারতের প্রতি বিরূপ মনোভাবকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভারত ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ এশিয়াকে নিজের স্বাভাবিক প্রভাববলয় হিসেবে দেখে এসেছে, যেকোনো প্রতিবেশী চীনের সাথে সম্পর্ক গভীর করলেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে বশ্যতা আশা করে এবং বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, ট্রানজিট শর্ত, নদীর পানি বণ্টনের মতো অর্থনৈতিক হাতিয়ারগুলো সমতাভিত্তিক অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে নয়; চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে ভারতের সাথে বিভিন্ন পর্যায় পার করেছে, যা স্থানীয়ভাবে প্রায়ই ভারতীয় হস্তক্ষেপ বা তাদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হিসেবে বর্ণিত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল সেই বৃহত্তর ও সবচেয়ে দৃশ্যমান অধ্যায়টিরই সর্বশেষ সংযোজন। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এবং এখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের অধীনে, ঢাকা আরো বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে— চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ, পাকিস্তানের সাথে সরাসরি যোগাযোগ পুনরায় শুরু এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর।

ঢাকার চোখে এটি নিছক সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ। তবু ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের আলোচনা এবং অনেক বাংলাদেশীর মতে, সমন্বিত প্রচার, এই পদক্ষেপগুলোকে হুমকিস্বরূপ বা অস্থিতিশীলকারী হিসেবে তুলে ধরেছে— একটি চীনা কোম্পানির সাথে সাধারণ ড্রোন উৎপাদন চুক্তি বা ওয়াশিংটনের সাথে বাণিজ্য চুক্তিকে এমনভাবে দেখানো হচ্ছে, যেন বাংলাদেশ ভারতের কক্ষপথ থেকে ‘সরে যাচ্ছে’ বা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশীরা প্রশ্ন তোলে— বাংলাদেশ কার সাথে ব্যবসায় করবে তা ভারত কেন নির্ধারণ করে দেবে? অন্য কোনো বড় শক্তি একটি সার্বভৌম প্রতিবেশীর কাছ থেকে এমন মাত্রার বশ্যতা আশা করে না।

আধিপত্যবাদী আচরণের এই ধারণা যে কারণে আরো জোরালো হয়ে ওঠে তা হলো, এই অঞ্চল নিয়ে ভারতের কথাবার্তার অসামঞ্জস্য। দিল্লি প্রায়ই তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সংযোগ, জ্বালানি চাহিদা ও নিরাপত্তাকে প্রতিবেশীদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল বলে তুলে ধরে, অথচ বিনিময়ে একই মাত্রার সহযোগিতা না দিয়েও পূর্ণ সহযোগিতা প্রত্যাশা করে। যেমন— তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখেছে। যদিও নিম্নাঞ্চলের বাংলাদেশকেই এর কৃষি ও পরিবেশগত মূল্য বহন করতে হয়। সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার পর ভারতের আরোপিত ভিসা নিষেধাজ্ঞা এবং ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে বাংলাদেশী পণ্য চলাচলে বিধিনিষেধকে অনেকে রুটিন বাণিজ্যনীতি নয়; প্রতিশোধমূলক অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে দেখেছেন। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এসব করেছেন শেখ হাসিনার সময়ের নস্টালজিয়া থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করতে ভারতকে মূলত শেখ হাসিনা যুগের সেই নস্টালজিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একে অপরের প্রতি সর্বস্বনির্ভর প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে দুই পক্ষকেই।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

hrmrokan@hotmail.com