পদত্যাগ করেছেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)।
চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবে অবসান হয় শেখ হাসিনা সরকারের। তিনি পালিয়ে যান ভারতে। এর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনও শেষ হয়। কিন্তু শেখ হাসিনা রেজিমের ছায়া টিকে ছিল বঙ্গভবনে মো: সাহাবুদ্দিনের উপস্থিতিতে। এ নিয়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছিল জনমানুষের মধ্যে। দেরিতে হলেও তার এ বিদায়ে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের ছায়া থেকে জাতি মুক্ত হয়েছে।
শেখ হাসিনার সময়ে এবং বিপ্লবের পর মো: সাহাবুদ্দিনের অনেক পদক্ষেপ ছিল বিতর্কিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার কিছু পুরনো কর্মকাণ্ড, শেখ হাসিনার প্রতি তোষামোদপূর্ণ আনুগত্য তার সাংবিধানিক পদের ভাবমর্যাদা বারবার ক্ষুণ্ন করেছে। শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়েও দ্বিমুখী বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। এ বক্তব্য রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলেছিল। সেনাপ্রধানের ঘোষণার পর তিনি প্রথমে শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা বলেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে তা অস্বীকার করেন। সেটা ফ্যাসিবাদী রেজিম ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা ছিল বলে মনে করা হয়। সেই সময়ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল তীব্র প্রতিবাদ করে। বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। এসব প্রতিবাদের মুখেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার দোহাই দিয়ে তাকে পদে বহাল রাখা হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার সাথে তার যোগাযোগ ছিল, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে এই সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ আছে, এমন খবর প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। সর্বশেষ অসুস্থতার জন্য লন্ডন গিয়েছিলেন মো: সাহাবুদ্দিন। লন্ডন গিয়ে শেখ হাসিনার সাথে যোগাযোগ করেছেন বলে অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। ধারণা করা হয়, এই যোগাযোগ তার বিদায় ত্বরান্বিত করেছে। পরে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন তিনি।
আমরা মনে করি, ফ্যাসিবাদের দোসর কিংবা গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে তার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা উচিত। তা ছাড়া শেখ হাসিনার সাথে তার যোগাযোগ দেশের সার্বিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। এ বিষয়গুলো গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। আইন অনুযায়ী তিনি এখন আজীবন অবসরভাতা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করবেন। তবে এটি মনে রাখা জরুরি- কোনো সাংবিধানিক পদ বা আইনি সুরক্ষাই অপকর্ম, অসদাচরণ এবং গণহত্যায় সহযোগিতার অপরাধকে মার্জনা করতে পারে না। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে তখনকার ফ্যাসিবাদী সরকার যখন ছাত্র-জনতার ওপর হত্যা চালায়, তার দায় তিনি এড়াতে পারেন না। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের অপকর্ম, দুর্নীতি কিংবা গণহত্যার মদদদাতা হিসাবে তার কোনো ভূমিকা চিহ্নিত হলে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোই হলো ইনসাফ।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক পদটি হওয়া উচিত তোষামোদমুক্ত ও নিরপেক্ষ। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়া জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদের প্রতি আহ্বান থাকবে- তিনি যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর তোষামোদ না করে নিরপেক্ষতা, সততা এবং গণ-আকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন। বাংলাদেশ যেন ভবিষ্যতে আর কোনো তোষামোদকারী বা বিতর্কিত ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে না দেখে।