জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল মানুষের আশা। সেই আশা ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার, যেখানে আইনের শাসন থাকবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকবে। নির্বাচন হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। গুম, খুন, নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রাজনীতি বিদায় হবে।
বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। জুলাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি ছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি অঙ্গীকার। আজ প্রশ্ন উঠছে, সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে আমরা কতদূর এগিয়েছি? সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় অনেকেই হতাশ। সরকার বলছে, সংস্কার চলমান; কিন্তু সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতি কোথায়?
আরো বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে গণভোটের বিষয়টি নিয়ে। সংসদে সরকারের একজন শীর্ষ মন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন বিলম্বিত না করার স্বার্থে সরকার গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এই বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, যদি গণভোটকে কেবল নির্বাচন এগিয়ে নেয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হয়ে থাকে, তাহলে জনগণের দেয়া রায়ের নৈতিক গুরুত্ব ক্ষুণ্ন হয়। কারণ গণভোট কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের প্রকাশ।
গণতন্ত্রে জনগণই সার্বভৌম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জ্যাঁ জাক রুশো বলেছিলেন, ‘সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের ইচ্ছার মধ্যেই নিহিত।’ এই ধারণাই আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি। তাই জনগণের প্রত্যাশা যদি বাস্তব নীতিতে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
আরেকটি প্রশ্ন এসেছে নির্বাচনী অঙ্গীকার নিয়ে। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। তাদের ৩১ দফায় সংবিধান সংস্কার, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোর দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছিল। বিচার বিভাগের পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো বা সচিবালয়ের বিষয়েও আলোচনা ছিল। সরকার গঠনের পর এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সরকার অবশ্য বলতে পারে, এসব সংস্কার সময়সাপেক্ষ; কিন্তু রাজনীতিতে শুধু ব্যাখ্যা নয়, দৃশ্যমান উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন, ‘ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের সম্মিলিত সম্মতি।’ সেই সম্মতি দুর্বল হয়ে যায় যখন ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
সংসদে, টেলিভিশনের টকশোতে কিংবা রাজনৈতিক সমাবেশে অনেক নেতার বক্তব্যের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠছে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলকে আক্রমণ করা। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। এটি একটি গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ; কিন্তু যখন রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা পেছনে চলে যায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই হয়ে ওঠে একমাত্র আলোচ্য বিষয়, তখন সন্দেহ বাড়ে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস নিয়ে এখন বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। কে কতটুকু ভূমিকা রেখেছে, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তথ্য, দলিল এবং নিরপেক্ষ গবেষণার ভিত্তিতে। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে আরো বিভক্ত করে।
বিএনপির কোনো কোনো এমপি জুলাই বিপ্লবকে স্বীকার করতে চান না। তারা জুলাই বিপ্লবকে বিতর্কিত করার জন্য যা তা বলে যাচ্ছেন। সংসদে বলছেন, টকশোতে বলছেন দলের সভা সমাবেশে বলছেন। তাদের এই বলা এটাই প্রমাণ করেছে, সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব এই বলাটাকে অনুমোদন দিয়েছেন। হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে জামায়াতকে খুঁজে পাওয়া যায়নি- এমন সব আজগুবি কথা বলা হচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জামায়াত-শিবিরের কী ভূমিকা তা তো সাধারণ মানুষ দেখেছে।
সরকারি দলের নেতাদের এসব বক্তব্যকে কাজে লাগাচ্ছে ফ্যাসিস্টদের দোসররা। তারা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে। তাদের একটি পলিসি হলো তারা বিএনপি সরকারের কোনো সমালোচনা করবে না। তাদের আক্রমণের টার্গেট জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও প্রফেসর ইউনূস। এদের ব্যাপারে সরকারের ‘উদার দৃষ্টিভঙ্গি’ও চোখে পড়ার মতো। গুম-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল, সংবিধান সংস্কার পরিষদ না করা, বিচার বিভাগকে আবার পুরনো অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ঘটনায় তারা রীতিমতো উল্লসিত। ফ্যাসিস্টদের দোসররা বলার চেষ্টা করছে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি ষড়যন্ত্র। হাসিনার হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে তারা একদম নীরব। হাসিনা যে নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল সে বিষয়ে তারা একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না।
অবাক করার বিষয় হলো সরকারি দল বিএনপির নেতারাও হাসিনার অপশাসন নিয়ে আর সরব নন। তারা যেন হাসিনা সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর পথ বেছে নিয়েছে। ইনু তার বক্তৃতায় সবসময় জামায়াত ও বিএনপির বিরুদ্ধে বিষোদগার করতেন। খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ছিল তার আক্রমণের মূল টার্গেট। আর সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, সরকারি দলের অনেক নেতার ওপর ইনু ভর করেছে। বিএনপির একজন নেতা ১০ মিনিট বক্তব্য রাখলে সাত মিনিটই বলেন জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধে। এই ধরনের বক্তাদের সরকার পুরস্কৃতও করছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, গণতন্ত্র দুর্বল হতে শুরু করে তখনই, যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে বৈধ প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জন-আস্থা ক্ষয়ে যায়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
নতুন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। কোনো সরকার যদি সংস্কারের পরিবর্তে কেবল ক্ষমতা পরিচালনাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে জনগণের প্রত্যাশা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
কোনো রাজনৈতিক দলই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। বিএনপি দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। দলটির অসংখ্য নেতাকর্মী কারাবরণ করেছেন। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেই ইতিহাস মানুষ জানে। তাই জনগণের প্রত্যাশাও বিএনপির প্রতি বেশি। কারণ মানুষ বিশ্বাস করেছিল, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা ভিন্ন ধরনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।
আজ সেই কারণেই প্রশ্নগুলো আরো জোরালো। সংবিধান সংস্কার পরিষদ কোথায়? বিচার বিভাগের কাঠামোগত স্বাধীনতা নিয়ে অগ্রগতি কোথায়? রাষ্ট্রের জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ কোথায়? জুলাই সনদের বাস্তবায়নের রোডম্যাপ কোথায়? এসব প্রশ্ন বিরোধী দলের নয়; এগুলো জনগণের প্রশ্ন। গণতন্ত্রে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়। বরং প্রশ্নহীন সমাজই গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
বাংলাদেশের মানুষ আর অতীতে ফিরতে চায় না। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না। নির্বাচন হবে জনগণের অবাধ মতপ্রকাশের উৎসব। বিচার বিভাগ থাকবে স্বাধীন। প্রশাসন হবে নিরপেক্ষ। রাজনৈতিক মতের কারণে কেউ গুম, নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হবে না। চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত একটি রাষ্ট্রই ছিল জুলাইয়ের স্বপ্ন।
সরকারের সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে; নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেয়ার সুযোগ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার চেয়ে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শক্তিশালী রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত বিজয় তখনই হবে, যখন রাষ্ট্র কোনো দল বা ব্যক্তির নয়, জনগণের হবে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন