হিমালয় থেকে নেমে এসেছে নদী। সাথে বয়ে নিয়ে এসেছে পলি। টনের পরে টন পলি এসে জমা হয়েছে সাগরে। আর ওই সব পলি থেকে জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। এর মানে বিশাল ব-দ্বীপ বাংলাদেশের জন্ম জল থেকে। আর জল থেকে জন্ম নেয়া এই বাংলাদেশ এখন হাবুডুবু খাচ্ছে জলে। একটু বৃষ্টি হলে জল-থই থই করে রাজধানী ঢাকা। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সড়কে ভাসে নৌকা।
কেন এমন হয়?
খুব সাদামাটাভাবে আমরা এই দায় চাপিয়ে দেই জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর। সব দোষ জলবায়ুর আর উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃস্বরণের! কার্বনের দোষ তো অবশ্যই আছে। কিভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানো যায়, তা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে, এটাও সত্য; কিন্তু কেবল আমরা চাইলে কি একযোগে সারা বিশ্ব কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে দেবে?
এটি রাতারাতি সম্ভব হবে না। এর জন্য দরকার বৈশ্বিক প্রচেষ্টা। বিশ্ব চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সেই চেষ্টাগুলো হয়তো তেমনভাবে কার্যকর হচ্ছে না। তাহলে আমাদের কী করার আছে? আমরা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকব?
গোটানো হাত নিয়ে তো বেঁচে থাকা যায় না। যাদের হাত নেই, তারা পা দিয়ে হলেও হাতের কাজ করার চেষ্টা করেন। যাদের হাত-পা দুটোই নেই। তারা হুইলচেয়ার জোগাড় করে নেন। এর মানে হলো- বাঁচতে হলে চেষ্টার ওপর থাকতে হবে। হাত নাড়াতে হবে। বৈরী পরিবেশে অভিযোজন করতে হবে।

আমরা চেষ্টা করছি। নতুন নতুন প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হচ্ছি। নগর-বন্দরের উন্নয়ন করছি; কিন্তু নিজেদের মাথা থেকে ঠিকঠাক বুদ্ধি খরচ করতে পারছি না। আমাদের শত শত ডিগ্রিধারী ইঞ্জিনিয়ার আছেন, পরিবেশবিদ আছেন। আছে হাইড্রোলিক পাম্প, রেইনওয়াটার ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার। মোগলদের এত কিছু ছিল না। ঢালাই করে ড্রেন বানানোর মতো শত শত কোটি টাকার বাজেটও ছিল না। তাদের ছিল বুদ্ধি। এই বুদ্ধি দিয়ে ভূগোলের নিয়ম-কানুন বুঝে নিত তারা। ১৬১০ সালের দিকে ফিরে তাকান- তখন ঢাকায় মোগল সুবাদার ছিলেন ইসলাম খাঁ। ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। রাজধানী মানে সেখানে শান-শওকত থাকবে। গড়ে তোলা হবে প্রাসাদোপম সব অট্টালিকা- সেটিই স্বাভাবিক। ইসলাম খাঁ যদি এ যুগের লোক হতেন, তাহলে হয়তো বুড়িগঙ্গা ভরাট করে অট্টালিকা বানিয়ে ফেলতেন; কিন্তু তিনি তো এই যুগের না, ওই যুগের। আর ওই যুগের লোকেরা আমাদের মতো এতটা ‘খামোশ’ ছিলেন না। ইসলাম খাঁ জানতেন, পলিমাটি দিয়ে গড়া ভূমিতে জলের সাথে যুদ্ধ করা যাবে না। জলের স্বাভাবিক গতি রাখতে হবে। তিনি নগর রক্ষা ও যোগাযোগের জন্য খনন করে দিলেন ধোলাই খাল। এ খাল বুড়িগঙ্গাকে যুক্ত করেছিল বালু নদীর সাথে। সেটি হয়ে উঠেছিল বাণিজ্যিক জলপথ, পানি নিষ্কাশনের চমৎকার ব্যবস্থা। সেই সাথে শত্রুর আক্রমণ থেকে শহর রক্ষার পরিখা হিসেবেও কাজ করত ধোলাই খাল।
মোগল আমলে ঢাকার ভেতর প্রাকৃতিক নালা আর খালকে সংযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়েছিল কুশলী নেটওয়ার্ক। এতে বর্ষা এলে ঢাকা ডুবে যেত না। বর্ষায় যোগাযোগব্যবস্থা আরো চাঙ্গা হয়ে উঠত। খুব সহজে নৌকা দিয়ে চলাচল করা যেত। আর এখন? কোটি টাকা খরচ করে পাকা রাস্তা আর বহুতল ভবন তুলে সেই জলপথগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বর্ষা এলে সড়ক ডুবে যায়। যানবাহনের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে যায়। মাইলের পর মাইল লেগে থাকে জ্যাম। এগুলো সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। লেখা হয় জলাবদ্ধতার কথা। জলের বদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী? এ নিয়ে সেমিনার হয়, সিম্পোজিয়াম হয়। বিশেষজ্ঞরা মতামত দেন। ইঞ্জিনিয়াররা আঁকিবুঁকি করেন। তারপর জলের জন্য বাজেট হয় কোটি কোটি টাকা। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এর আগের এক দশকে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন নালা নির্মাণ, ড্রেন সংস্কার, খাল পরিষ্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে অন্তত দুই হাজার ১৪৬ কোটি টাকা খরচ করেছে। এত টাকা গেল কোথায়?
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, জলজট হতে পারে এমন ১৯টি স্থান চিহ্নিত আছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র সাতটায় জলজট হতে পারে, তাও সেসব স্থান থেকে পানি নেমে যাবে তিন ঘণ্টার মধ্যে। নগরবাসী আশায় বুক বেঁধেছিল- এবার বুঝি একটা কিছু হবে; কিন্তু সব ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো। ১২ ঘণ্টায় মাত্র ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিতে ঢাকা পরিণত হয়ে গেল ‘খালের নগরী’তে। মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি, মতিঝিল থেকে শুরু করে বারিধারা ও বাড্ডার মতো এলাকাগুলো থই থই করল। বহুতল ভবনের নিচতলায় পানি ঢুকে গেল। অথচ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নালা বানানোর পেছনে খরচ করেছে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ড্রেনের ভেতর ১০০ কোটি টাকা ঢেলেছে ওয়াসা। ২০২০ সালে এসে পানিনিষ্কাশনের ভার দিয়ে দেয়া হলো দুই সিটির কাছে। পরের চার বছরে ঢালা হলো ৭৩০ কোটি টাকা। জলের জন্য বরাদ্দ করা এসব টাকা কোথায় গেল? আসলে জলের টাকা জলে গেছে!
সাদামাটা হিসাবে বলা যায়, লুটপাটের উৎসব করার পেছনে টাকা গেছে। যতটুকু কাজের জন্য খরচ হয়েছে, ততটুকুর সবটাই অপরিকল্পিত। সত্যি কথা হলো- টাকাগুলো জলে ফেলা হয়। এ কারণে রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমে না। বর্ষা শেষে নতুন বাজেট হয়। সড়ক খুঁড়াখুঁড়ি হয়। ড্রেন বানানো হয়। পাঁচ মাস পর অন্য আরেকটা খাতে বাজেট আসে। আবার সড়ক খোঁড়া হয়। পাঁচ মাস আগে তৈরি করা ড্রেন কেটে-ফেটে যায়। তারপর আবার বাজেট। এভাবে চলতেই থাকে...
এসব ‘চলমান উন্নয়ন’ নিয়ে টিকে আছি আমরা। টিকে আছে রাজধানী ঢাকা। অথচ এ শহর সারা দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। চট্টগ্রাম হলো বাণিজ্যের ফুসফুস। যখন ঢাকায় পানি জমে, চট্টগ্রামের সড়কে নৌকা চলে। তখন পুরো দেশের অর্থনীতির কী দশা হয়?
এক গবেষণা বলছে- ঢাকায় জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ পলিথিন আর অপচনশীল প্লাস্টিক। সিটি করপোরেশনের লোকেরা যখন ড্রেন পরিষ্কার করতে নামেন, দেখা যায় ড্রেনের মুখে আটকে আছে পলিথিন আর চিপসের প্যাকেট। সেই শক্ত প্রাচীর ভেদ করে ড্রেনে নামতে পারে না পানি। এসব পলিথিন কারা ফেলেন? আমরাই তো।
তাহলে দায় আমাদেরও আছে। তবে মূল দায় নীতিনির্ধারকদের। চারদলীয় জোট সরকারের সময় পলিথিন নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তখন পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল। এ নিষেধাজ্ঞা জারি রাখতে পারলে এতদিনে আমরা হয়তো অনেকটা এগিয়ে যেতে পারতাম। পরিবেশ নিয়ে হয়তো এতটা হায়-হুতাশ থাকত না। কিন্তু আমাদের মতো ‘মন্দ’দের পেটে কি ভালোকিছু হজম হয়! আমরা শঙ্কর জাতি, এখনো নিজেদের জাতীয় চরিত্র দাঁড় করাতে পারিনি। আমাদের উৎপত্তি হয়েছে নানা জাতির রক্তের ধারা থেকে। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে এ রক্তের ধারা এসেছে অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মঙ্গোলয়েড, আর্যদের থেকে। সম্ভবত এ কারণে একমত হয়ে নিজেদের ভালোর নীতি নিজেরা ঠিক করতে পারি না! নেদারল্যান্ডসের মতো একটা দেশ- সাগরের পিঠ থেকে নিচে এর ভূমি। তাদের তো বারো মাস সাগরের নিচে ডুবে থাকার কথা! কিন্তু তারা বুদ্ধি খাটিয়েছে। সাজিয়েছে মাস্টারপ্ল্যান। পানিকে বন্ধু বানিয়ে নিয়েছে। নদী ও খালের চার পাশের এলাকা খুলে দিয়েছে। অতিরিক্ত পানি এসে সেখানে জমা হয় এবং স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হয়। মাটির নিচে বানিয়ে নিয়েছে বিশাল বিশাল ওয়াটার রিজার্ভার। বর্ষায় ওই সব রিজার্ভারে পানি জমা হয়। শুকনায় সেই পানি ব্যবহার হয় পুরো শহরে। জাপানেও এ ব্যবস্থা আছে। টোকিওতে টাইফুন হয়, অতিবৃষ্টি হয়। সেখানে মাটির নিচে তৈরি করে রাখা আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা। শহরের অতিরিক্ত পানি সেখানে গিয়ে জমা হয়। তারপর বিশাল মেগা-পাম্প চালু করে নদীতে ফেলে দেয়া হয় সেই পানি। কী চমৎকার সিস্টেম- চিৎকার চেঁচামেচি নেই, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির দরকার হয় না। ড্রেন পরিষ্কারের নামে কোটি কোটি টাকা জলেও ফেলা হয় না সেখানে। ঢাকার জন্য এমন ধরনের কোনো পরিকল্পনা এখনো কেউ তৈরি করেননি। যেখানে পানি জমে থাকার খবর আসে, সেখানে ড্রেনের কাজ করা হয়; কিন্তু এই ড্রেন দিয়ে পানি কোথায় যাবে, কোন নদীতে গিয়ে মুক্ত হবে- সেটি ভাবা হয় না। যতদিন ভাবা হবে না, ততদিন আমাদের জলের টাকা জলেই যেতে থাকবে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত