চুয়াডাঙ্গায় বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ, মূল্য দিচ্ছে সন্তানেরা

Printed Edition

মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)

চুয়াডাঙ্গায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা। গত তিন বছরের পরিসংখ্যান বলছে, বিয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাশাপাশি বাড়ছে বিচ্ছেদের সংখ্যাও। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সন্তানদের ওপর। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে অনেক শিশু মানসিক চাপ, শিক্ষাজীবনে প্রতিবন্ধকতা ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা রেজিস্ট্রার নিবন্ধন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে জেলায় সাত হাজার ৪০৯টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়। একই বছরে নিবন্ধিত তালাকের সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ২৮৯টি। ২০২৪ সালে বিয়ের সংখ্যা বেড়ে আট হাজার ১০৬টি হলেও তালাক হয়েছে পাঁচ হাজার ৫২১টি। ২০২৫ সালে বিয়ে কিছুটা কমে সাত হাজার ৬৩৩টি হলেও বিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৫৩০টিতে। তিন বছরে মোট ২৩ হাজার ১৪৮টি বিয়ের বিপরীতে ১৬ হাজার ৩৪০টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য ভেঙে যাওয়া পরিবার ও মানসিক যন্ত্রণার গল্প। একটি পরিবার ভেঙে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে শিশুরা। অনেক ক্ষেত্রে তারা বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, আচরণগত পরিবর্তন, হতাশা ও মানসিক চাপের মতো সমস্যায় ভুগতে হয় তাদের।

চুয়াডাঙ্গা জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মারুফ সরোয়ার বাবু বলেন, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক অস্থিরতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারসহ নানা কারণে বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। তবে বিচ্ছেদের আগে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। কারণ বিচ্ছেদের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

সামাজিক সংগঠন লোকমার্চার সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা মহিলা ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক চাপ, মাদকাসক্তি, সহনশীলতার অভাব এবং পারিবারিক মূল্যবোধের দুর্বলতা দাম্পত্য সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক ছোটখাটো বিরোধও এখন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে তা বিচ্ছেদে দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বর্তমানে তালাক সামাজিকভাবে আগের তুলনায় বেশি গ্রহণযোগ্য হওয়ায় অনেকেই দ্রুত বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে নিচ্ছেন। তবে নির্যাতন বা গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ প্রয়োজনীয় হলেও সাময়িক রাগ বা অভিমান থেকে নেয়া সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে সন্তানদের জীবনে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পারিবারিক কাউন্সেলিং, সচেতনতা বৃদ্ধি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া গেলে বিচ্ছেদের হার কমানো সম্ভব। কারণ একটি বিচ্ছেদ শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবসান নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ ও একটি পরিবারের স্থিতিশীলতা।