প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২ এপ্রিল ৬০টি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপে বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থির হয়েছে। দেশগুলো তাদের অর্থনীতির ওপর এ আঘাত মোকাবেলায় তৎপর হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে ৫০টি দেশ কিছু সুবিধা নিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেছে। বেশির ভাগ দেশ বাড়তি সুবিধা দিয়ে হলেও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের রফতানিবাণিজ্য স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা চালাচ্ছে। যে অল্প কয়টি দেশের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র তার অন্যতম।
বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্ক আমাদের রফতানিবাণিজ্যকে বিপুল ক্ষতি করবে। এ অবস্থায় আমাদের উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
সঙ্কট অনেকসময় সুযোগের দ্বার উন্মোচন করে। বাড়তি শুল্ক আরোপ আমাদের সে ধরনের সুযোগ এনে দিতে পারে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানত তৈরী পোশাক রফতানি করি। আমাদের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, এ ছাড়া ভারতও রয়েছে। দেশ দু’টি ইতোমধ্যে তার শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেনদরবার করেছে। পাঁচ দিনের মাথায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা আলাদা করে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে চিঠি লিখেছেন। উভয় চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বাড়ানোর আগ্রহ দেখানো হয়েছে। চিঠিতে জানানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯০টি পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ কোনো শুল্ক আরোপ করেনি। এখন আরো ১০০টি পণ্য শুল্কমুক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। গম, ভুট্টা, সয়াবিনসহ নানাবিধ কৃষিপণ্য আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান রাখার আশ্বাস দেয়া হয়েছে চিঠিতে। আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল তুলা আমদানি করি বিনাশুল্কে। এই তুলা থেকে উৎপন্ন কাপড় আবার যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা হয়। একইভাবে লোহার স্ক্র্যাপ আমদানিতে মাত্র ১ শতাংশ শুল্ক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশী পণ্যের ওপর অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা প্রত্যাহারের পর থেকে বাংলাদেশ প্রত্যেকটি পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে আসছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যে গড়ে ৬ থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ কোনোভাবে ন্যায্য হতে পারে না। বাণিজ্য উপদেষ্টার চিঠিতে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। আশা করা যায়, এই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য আলোচনায় সুফল মিলতে পারে।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে বাড়তি শুল্ক তিন মাস স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছে যুক্তরাষ্ট্রকে। ভিয়েতনাম তার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বিপরীতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতের ওপর আরোপ করা পাল্টা শুল্ক আমাদের চেয়ে বেশ কম, ২৭ শতাংশ। ভারত আরো এক মাস আগে থেকে এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেনদরবার করছে। দেশ দু’টি যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আগেভাগে সুরাহা করতে পারে, সুবিধা আদায় করে নেয়, তাহলে আমাদের পোশাক রফতানির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে কিছু ক্রয়াদেশ স্থগিত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
২ এপ্রিলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে শুল্ক আরোপের প্রভাব নিয়ে পরামর্শ করেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়েও আলাদা পরামর্শসভা হয়েছে। বিগত কয়েক দিনে ব্যবসায়ী, বাণিজ্য বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদদের সাথে বৈঠক করেছে সরকার। সরকারের এসব প্রচেষ্টা ইতিবাচক। তবে আমরা মনে করি, প্রতিযোগীদের তুলনায় চেষ্টার ক্ষেত্রে আমরা যেন কোনোভাবেই পিছিয়ে না পড়ি, সে দিকে সরকারের দায়িত্বশীলদের নজর রাখতে হবে।