চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে

Printed Edition
first-6
টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম মহানগরীর কাতালগঞ্জ এলাকা : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম

  • বৈরী আবহাওয়ায় ৩টি ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণ
  • চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ৪১২.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি
  • ধসে পড়েছে আউটার রিং রোডের একাংশ

টানা ভারী বৃষ্টিতে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪১২.৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভারী বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি একাকার হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক জনভোগান্তি দেখা দিয়েছে। ভারী বৃষ্টিতে সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে পতেঙ্গা এলাকায় আউটার রিং রোডের একাংশ ধসে পড়েছে। বৃষ্টির পাশাপাশি ঝড়ো হাওয়ায় বৈরী পরিবেশের কারণে আবুধাবি ও সারজাহ থেকে আসা পৃথক দু’টি বিমানকে ঢাকায় অবতরণ করতে হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামতে না পেরে ফিরে গেছে।

সরেজমিন দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ন এলাকা নিমজ্জিত হয়েছে। এসব এলাকায় কোথাও কোথাও কোমর সমান পানি জমেছে। ফলে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। বিশেষ করে চাকরিজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ ও জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষগুলোকে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নগরীর অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করলেও কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরীক্ষা নিয়েছে। ফলে এসব শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এর মধ্যে আবার অফিসমুখী মানুষকে চট্টগ্রামের অফিসপাড়াখ্যাত আগ্রাবাদ এলাকার সড়ক হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা জানিয়েছেন, এ ধরনের ভারী বৃষ্টিপাত আগামী কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে। মৌসুমী বায়ু সক্রিয় রয়েছে।

এ দিকে টানা ভারী বৃষ্টিতে নগরীর বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, ফরিদারপাড়া, চান্দগাঁও, চকবাজার, বহদ্দারহাট, প্রবর্তক মোড়, বাকলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা, কাট্টলীর ঈশান মহাজন সড়ক, হালিশহরের কে ও এল ব্লকের সোনালি আবাসিক, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কের বড়দীঘিরপাড় এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নগরীর আগ্রাবাদ ও কাতালগঞ্জে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি হয়েছে। কাতালগঞ্জ এলাকার বাসিন্দারা সোমবার রাত থেকে গতকাল দিনভরই পানিবন্দী ছিলেন।

ধসে পড়েছে আউটার রিং রোডের একাংশ

ভারী বর্ষণের কারণে সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় আউটার রিং রোড সড়কের ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পাশে একটি অংশ ধসে পড়েছে। এই সড়ক ব্যবহার করে বন্দরের ট্রাক ও বিমানবন্দরের যানবাহন চলাচল করে। তাই দ্রুত সড়কটি মেরামত করা না হলে আমদানি রফতানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেললাইন পানির নিচে

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানান, চট্টগ্রামে রেললাইনের ওপর পানি জমে থাকায় প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন আটকা পড়েছে। গতকাল বেলা পৌনে একটার দিকে নগরীর ষোলশহরে ট্রেনটি আটকা পড়ে। পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি বেলা ২টা ৪০ মিনিটে কক্সবাজারে পৌঁছানোর সময় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ওই সময় চট্টগ্রাম শহরেই অতিক্রান্ত হয়ে যায়। রেললাইনের পানি সরার পর ট্রেনটি পুনরায় কক্সবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে বলে রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে গতকাল সকাল সোয়া ৬টায় ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে ট্রেনটি। বেলা ১২টা ৩৫ মিনিটে চট্টগ্রামের ষোলশহর স্টেশন অতিক্রম করে। এরপর কিছু দূর গিয়ে টানা বৃষ্টির কারণে রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ট্রেনটির চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এ দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকায় ট্রেনটির হাজারো যাত্রীকে দুপুরের খাওয়াদাওয়াসহ প্রাকৃতিক কর্ম সারতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

বৃষ্টিতে ভাসছে কর্ণফুলীর উপকূলীয় এলাকা

কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, টানা তিন দিনের বর্ষণ ও জোয়ার-ভাটার প্রভাবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের সড়ক, বসতবাড়ি ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং খাল-নালার নাব্যতা কমে যাওয়ায় অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। বিশেষ করে চরপাথরঘাটা, শিকলবাহা, জুলধা ও বড় উঠান ইউনিয়নের নিচু এলাকায় মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার ঘরবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।

এ দিকে অতিবৃষ্টির কারণে স্থানীয় বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছোট ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জেলেরা বৈরী আবহাওয়ার কারণে নদীতে নামতে পারছেন না, ফলে তাদের আয়ও কমে গেছে।

বান্দরবানের আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধার

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া ৭৮ পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে দুর্গম তিন্দু ও রেমাক্রি এলাকার বড় পাথর ঞাফা খুম প্রমুখ এলাকা থেকে পাঁচটি শক্তিশালী ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে তাদের উদ্ধার করে ফ্রান্সিল সদরে নিয়ে আসা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, বিজিবি, দমকল বাহিনী, পর্যটক গাইড ও স্থানীয়দের সহায়তায় এসব পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। গত তিন দিনের টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু নদী ও রেমাক্রি খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রচণ্ড স্রোতের কারণে শতাধিক পর্যটক বিভিন্ন এলাকায় আটকা পড়েন। পরে স্থানীয় প্রশাসন তাদের উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়। থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল জানিয়েছেন উদ্ধারকৃত পর্যটকরা এখন নিরাপদে রয়েছে। তাদের বান্দরবান জেলা সদরে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এ দিকে প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সাঙ্গু মাতামুহুরী ও বাকখালী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বান্দরবান শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সাতটি উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২২০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বান্দরবানের সাথে বগালেক কেওক্রাডং সড়কে পাহাড় ধসে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

জরুরি পদক্ষেপ দাবি জামায়াতের

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আমির আলা উদ্দীন সিকদার এবং জেলা সেক্রেটারি আব্দুল জব্বার এক যৌথ বিবৃতিতে অতি বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা নিরসন, পানিবন্দী মানুষের নিরাপদ উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল এক বিবৃতিতে তারা বলেন, টানা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলার বিভিন্ন থানা ও ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে বহু রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে, বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক পরিবার পানিবন্দী হয়ে মানবিক সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছে।

নেতৃদ্বয় বলেন, জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলে আটকে পড়া মানুষদের দ্রুত উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

সমুদ্র বন্দরে ৩ নং সতর্ক সঙ্কেত বহাল

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উড়িষ্যা ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড এলাকায় অবস্থানরত মৌসুমি স্থল নিম্নচাপটি উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে বর্তমানে সুস্পষ্ট লঘুচাপ আকারে পূর্ব মধ্য প্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরো পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, সুস্পষ্ট ল্যঘুচাপের কেন্দ্রস্থল, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে।

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

বৃষ্টির পূর্বাভাস

এ দিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে আজ বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি-বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।