চিকিৎসাব্যয় বাড়ার শঙ্কা বিরোধীদলীয় নেতার
মিটিংয়ের নোটিশ নিয়ে সংসদে ক্ষোভ
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
প্রস্তাবিত নতুন একটি বিলের ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা। একইসাথে একটি বিশেষ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের নোটিশ যথাসময়ে না পাওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় এক সংসদ সদস্য।
গতকাল জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তারা এ বিষয়ে কথা বলেন।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বিলের বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এখানে প্রফিট-নন প্রফিট কনসার্নের কথা বলা হয়েছে। যখন এখান থেকে ইনকাম জেনারেট করার ইচ্ছা থাকবে, স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসাব্যয় বাড়বে। বাজেটে জনগণের পকেট মানি কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হলেও এই বিলের সেন্স তার বিপরীত। তিনি আরো বলেন, এ ধরনের কোম্পানি শেয়ার করতে এলে আগামীতে একটি ‘আনহেলদি কম্পিটিশন’ বা অসুস্থ প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি হবে। এর মাধ্যমে জনগণের প্রাপ্তির চেয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর প্রাপ্তি বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আপনি একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক। বিলটি কেবল উপস্থাপিত হয়েছে। বিবেচনার সময় আপনাকে দীর্ঘ সময় দেয়া হবে, তখন পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করবেন।
১০টার মিটিংয়ের মেসেজ ৯টা ১৯-এ! : অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। তিনি অভিযোগ করেন, বিশেষ কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে সভার নোটিশ দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, সকাল ১০টায় মিটিং, আর আমাকে মেসেজ দেয়া হয়েছে ৯টা ১৯ মিনিটে! ১০টা ১৯ মিনিটে সভাপতির পিএস ফোন করে বলেন মিটিং চলছে। গুরুত্বপূর্ণ কমিটির মিটিংয়ের খবর কি মেসেজে হয়? ম্যাজিক জানা না থাকলে এই অল্প সময়ে উপস্থিত হওয়া সম্ভব নয়। আমাকে যথাসময়ে খবর দেয়া হলো না কেন?
স্পিকারের নির্দেশনা : সংসদ সদস্যের এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্পিকার সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটির সভাপতিকে ভবিষ্যতে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দেন। স্পিকার বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরণের ব্যাপারে প্রত্যেক সদস্যকে যথেষ্ট সময় দিয়ে নোটিফাই করার জন্য আমি সভাপতিকে অনুরোধ জানাচ্ছি। ভুলভ্রান্তি হতে পারে, তবে ভবিষ্যতে যাতে না হয় সে ব্যাপারে যতœবান হতে হবে। অধিবেশনে এ সময় উপস্থিত সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে মাওলানা রফিকুল ইসলামের এ পয়েন্ট অব অর্ডারকে সমর্থন জানান।
সরকারি অফিসগুলেতে শূন্য পদ ৫২১৯২২টি-জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী : ২০২৫ সাল পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী সরকারি অফিসগুলেতে অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি এবং শূন্য পদ রয়েছে পাঁচ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো: আব্দুল বারী। এ সব শূন্য পদ পূরণে সরকার এরই মধ্যে ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বলেও তিনি জানান। গতকাল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহারের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো: আব্দুল বারী বলেন, ২০২৫ সাল পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী সরকারি অফিসগুলোতে অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি এবং শূন্য পদ রয়েছে পাঁচ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি। শূন্য পদ পূরণে সরকার এরই মধ্যে ছয় মাস, এক বছর এবং পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। কর্মপরিকল্পনায় বর্ণিত ‘স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ’ এর বিষয়ে অন্যান্য মন্ত্রণালয়-বিভাগের নিয়োগের সর্বশেষ অবস্থা এবং শূন্য পদে নিয়োগের তথ্য এবং নিয়োগের অধিযাচন প্রেরণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হতে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া দ্রুততম সময়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগের বিষয়ে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য সব মন্ত্রণালয়-বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে।
মামলাজট কমাতে বিচারক নিয়োগ করবে সরকার-আইনমন্ত্রী : মামলাজট কমাতে দেশের উচ্চ আদালত এবং অধস্তন আদালতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারপতি ও বিচারক নিয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান।
সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২০তম দিন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নানের লিখিত প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেন। সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নান তার প্রশ্নে জানতে চান দেশের উচ্চ আদালতে ও নিম্ন আদালতের মামলাজট কমাতে নতুন করে বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
জবাবে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আাপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০১ জন বিচারপতি কর্মরত আছেন। উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তির জন্য সরকার সংবিধানের আলোকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
মন্ত্রী জানান, দেশের অধস্তন আদালতগুলোয় বর্তমানে দুই হাজার ৬২০ জন বিচারকের পদ রয়েছে এবং ওই পদগুলোর বিপরীতে এক হাজার ৯৬৪ জন বিচারক কর্মরত আছে। অধস্তন আদালতগুলোর শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন কর্তৃক ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার মাধ্যমে ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া ১৯তম বিজেএস পরীক্ষার মাধ্যমে ১৫০ জন এবং ২০তম বিজেএস পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০ জন সিভিল জজ নিয়োগের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন বরাবর চাহিদাপত্র প্রেরণ করা হয়েছে। উক্ত চাহিদাপত্র অনুযায়ী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন কাজ করছে।
প্রকৃত অপরাধীদেরই বিচার নিশ্চিত করবে সরকার-আইনমন্ত্রী : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে কোনো রাজনৈতিক হয়রানি নয়, বরং শুধুমাত্র প্রকৃত অপরাধীদের বিচার নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করছে সরকার। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পলাতক আসামিদের জন্য সরকারি খরচে আইনজীবীও নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের ২০তম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান এ কথা বলেন। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তারের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, পলাতক আসামিদের ন্যায্য বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) রুলস অব প্রসিডিউর, ২০১০’ অনুযায়ী ১৭টি মামলায় ৪৪ জন আইনজীবীকে ‘স্টেট ডিফেন্স ল ইয়ার’ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার নিশ্চিত করছে যে, শুধুমাত্র যারা প্রকৃত অপরাধ করেছে তাদেরই বিচার হবে। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ পুনর্গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচার কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
মন্ত্রী আরো জানান, আসামিদের দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার এবং আইনজীবীর সাথে একান্তে কথা বলার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। পলাতক হয়ে বিচার এড়ানোর প্রবণতা রোধ করতে ট্রাইব্যুনালকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে।
পাঁচ বছরের অধিক পুরাতন মামলা চিহ্নিত করে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে -আইন মন্ত্রী : পাঁচ বছরের অধিক পুরাতন মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করে দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান।
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে আইন মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান এ কথা জানান। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন বিচারাধীন বন্দীদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইন ও বিচার বিভাগ কর্তৃক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেসব কাজের প্রস্তাবের কথা জানালেন মন্ত্রী : তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেসব কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে সে বিষয়গুলো জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মো: শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। সংসদ সদস্য মো: রায়হান সিরাজীর এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে পানিসম্পদ মন্ত্রী এ কথা জানান। পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা নদীর উজানে বাঁধ দেয়াসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে; শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ কমে যায়। যার ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পসহ কৃষি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে উজানে অতিবৃষ্টির কারণে হঠাৎ বন্যা ও নদীভাঙন সংঘটিত হয়।
মন্ত্রী বলেন, তিস্তা এলাকার পাঁচটি জেলায় (রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা এবং লালমনিরহাট) নদীভাঙন রোধে বিগত ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২২২.২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ৪২.১৭ কি.মি. নদীতীর সংরক্ষণ কাজ এরই মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। তাছাড়াও তিস্তা নদী কেন্দ্রিক টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি সমীক্ষা কার্যক্রম এরই মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এই সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে, ১১০ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ (নদীশাসন); ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং; ২২৪ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বাঁধের ওপর রাস্তা নির্মাণ; ৬৭ টি গ্রোয়েন/স্পার নির্মাণ ও মেরামত; এবং ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন কাজ প্রস্তাব করা হয়েছে। উক্ত সমীক্ষার কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।