বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করার সুযোগকে দেশের ভাবমর্যাদা রক্ষায় কাজে ব্যবহার করার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। দেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কাজের সুযোগ এলে সবচেয়ে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তি বাছাই করা হয়। বিভিন্ন দেশ একে পুরোপুরি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। নিজেদের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিকে এতে যোগ দেয়ার সুযোগ করে দেয়। পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুযোগও দলীয়করণ ও পারিবারিকীকরণের কাজে লাগিয়েছেন শেখ হাসিনা। জাতিসঙ্ঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিজের মেয়েকে লবিং করে নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। এজন্য নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেন। এখন পতিত শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল দেশের জন্য দুর্নাম কুড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ছিটকে পড়েছেন।

২০২৩ সালে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচন হয়। এ অঞ্চলে আছে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার ও নেপালসহ ১১টি জনবহুল দেশ। বসবাস করে ২০০ কোটি মানুষ। দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল হিসেবে এখানে নানা ধরনের রোগব্যাধির প্রকোপ মোকাবেলায় ডব্লিউএইচওর ৫০ কোটি ডলার বাজেট বণ্টনের গুরুদায়িত্ব থাকে আঞ্চলিক পরিচালকের ওপর। ওই সময় এ দায়িত্ব নিতে নেপালের ডাক্তার শম্ভু প্রসাদ আচার্য সবচেয়ে উপযুক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্ব সংস্থাটিতে ৩০ বছরের দীর্ঘ সময় কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। সদস্য দেশগুলো অভিজ্ঞ এ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে পদটিতে নিয়োগ দেয়ার চিন্তা করছিল। ওই সময় শেখ হাসিনা তার সরকারি প্রভাব খাটিয়ে এই কাজে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকা নিজের কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে এই পদে নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

এই কাজে উপযুক্ত হিসেবে তিনি যে সনদ ডব্লিউএইচওর কাছে পেশ করেন, তাও জালিয়াতি করেছেন বলে খোদ প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ করেছে। এর সাথে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানটি সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে চীন সফরে অর্থ নয়ছয়ের প্রমাণ হাজির করেছে। এদিকে অবৈধভাবে প্লট জালিয়াতি করতে দেশের আদালত তাকে পাঁচ বছরের সাজা দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন নিশ্চিত করেছে, তাকে এই পদে নিয়োগ দিতে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় করেছেন। এসব তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ডব্লিউএইচও যখন তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেয়; তখন পুতুল সংস্থাটি থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে পরিচালক পদে মনোনয়ন দেয়ার সময় চিকিৎসাবিষয়ক বিশ্বখ্যাত সাময়িকী দ্য ল্যানসেট এক সম্পাদকীয়তে তার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নানাভাবে বিষয়টি সমালোচনায় এলেও একটি প্রভাবশালী দেশের সমর্থনে পুতুলের নিয়োগ তখন সফল হয়।

শেখ হাসিনা দেশে অনিয়ম দুর্নীতিতে সয়লাব করে গেছেন। তিনি এই দুর্নীতি সংক্রমণ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়েছেন। দুর্ভাগ্য হচ্ছে— এজন্য দুর্নামের শিকার হতে হলো বাংলাদেশকে। এ থেকে আমাদের শিক্ষণীয় আছে। দেশে আমরা দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে না পারলেও অন্তত সতর্ক থাকতে হবে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনে। যাতে দেশীয় অনিয়ম দুর্নীতির হাত ধরে ওই সব প্রতিষ্ঠানে অযোগ্য অদক্ষ কোনো লোক নিয়োগ দিয়ে না বসি। সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের অবমাননাকর পদত্যাগ থেকে আমাদের এ শিক্ষা নিতে হবে।