ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে দেশে প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের মূল্যায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ উচ্চশিক্ষায় এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
নয়া দিগন্তের খবর, শিক্ষকদের মধ্যে কেউ উদ্যোগটিকে ইতিবাচক বলেছেন। আবার কেউ অনধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের মতামতের এ ধারণা নীতিগতভাবে ইতিবাচক। উন্নত বিশ্বের প্রথম সারির প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টিচিং ইভালুয়েশন সিস্টেম’ একাডেমিক কাঠামোর একটি নিয়মিত অংশ। সেই ব্যবস্থা যখন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ছাত্রসংগঠন বা ব্যক্তির উদ্যোগে চালুর প্রশ্ন ওঠে, তখন এর স্থায়িত্ব, বস্তুনিষ্ঠতা এবং প্রশাসনিক বৈধতা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়া স্বাভাবিক।
শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের পাঠদানপদ্ধতি, কোর্স-কাঠামো, পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও যোগাযোগের সুযোগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত। এদেশে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে যে একমুখী ধারণা বিদ্যমান; তা ভেঙে একটি গঠনমূলক ফিডব্যাক কালচার গড়ে ওঠার প্রারম্ভিক পদক্ষেপ হিসেবে ডাকসুর উদ্যোগটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। তবে এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তা-ও আমলযোগ্য।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল কাজ প্রশাসনিক ও নীতিগত কাঠামোর আওতায় সম্পন্ন হওয়া সমীচীন। কোনো অনানুষ্ঠানিক বা ছাত্র সংসদের উদ্যোগে চালু হওয়া প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিবিদ্বেষ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রেটিং কিংবা পক্ষপাতমূলক মূল্যায়নের ঝুঁকি থেকে যায়। তাছাড়া, একজন শিক্ষকের শিক্ষাদানের দক্ষতা কেবল শিক্ষার্থীদের পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করে না। এতে বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড ও একাডেমিক কাঠামোর প্রয়োজন আছে। উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে শিক্ষকের মূল্যায়ন উন্মোচন হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রকৃতপক্ষে এই বিতর্কের পেছনের মূল কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দীর্ঘসূত্রতা। প্রোভিসির দেয়া তথ্য মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ‘টিচিং ইভালুয়েশন’ নীতিমালা অনুমোদিত থাকা সত্ত্বেও তা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ডাকসুকে এমন একটি উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত বা বাধ্য করেছে। একটি দায়িত্বশীল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাজ শুধু ছাত্র সংসদের উদ্যোগকে ‘অনধিকার চর্চা’ বলে খারিজ করে দেয়া নয়। বরং শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া।
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক মূল্যায়ন বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। তবে প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রশাসনিক ও একাডেমিক নিয়মনীতির অধীনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত ডাকসুর এই উদ্যোগ থেকে প্রাপ্তপাঠ ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে অবিলম্বে নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ও সুরক্ষিত প্ল্যাটফর্মে ‘টিচিং ইভালুয়েশন’ নীতিমালা কার্যকর করা। যেখানে মূল্যায়নের ফল কেবল সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধানের কাছে পৌঁছাবে, যা শিক্ষককে নিজের উন্নতির সুযোগ দেবে। সেই সাথে উচ্চশিক্ষার ভাবমর্যাদাও রক্ষা করবে। ডাকসুর মতো অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনগুলোর দায়িত্ব হবে সেটি উন্মুক্তভাবে নিজেরা পরিচালনা না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিয়ে দ্রুত কার্যকর করতে চাপ দেয়া। আমরা মনে করি, একটি সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষাদানের মান বাড়ানো এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব।