আমাদের দেশে একটি কথা চালু আছে— ‘সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল’। এটি বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ বা প্রবচন; যার অর্থ— সরকারি সম্পত্তি বা জনগণের সম্পদ যত্রতত্র অপব্যয় করা। নষ্ট করা বা কোনো জবাবদিহি ছাড়া তছরুপ করা। দেশের উন্নয়নকাজ নিয়ে এ কথা শতভাগ খাটে। গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামো গড়ে তোলার নামে এমন সব কালভার্র্ট-ব্রিজ ও স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সে সবের অনেকগুলো আর জনস্বার্থে কাজে আসেনি। তেমনি একটি প্রকল্প হলো বরিশালের উজিরপুরে সন্ধ্যা নদীতে ফেরি সার্ভিস চালুর উদ্যোগ। প্রকল্পটি বেশ কয়েক বছর আগে শেষ হলেও তার সুফল থেকে উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, মানুষের যোগাযোগ সহজ করতে কোটি টাকা ব্যয়ে পন্টুন ও গ্যাংওয়ে স্থাপন করা হয়েছিল বরিশালের উজিরপুরে সন্ধ্যা নদীতে। কিন্তু স্থাপনের পর কয়েক বছর চলে গেলেও এক দিনের জন্যও চালু করা হয়নি ফেরি সার্ভিস। এতে করে পুরো অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে আছে। ফলে পড়ে থাকা ফেরিতে মরিচা ধরছে। পানিতে থাকা পন্টুন ও গ্যাংওয়ের বিভিন্ন অংশেও দেখা দিয়েছে ক্ষয়। অবস্থা এমন যে, সরকারি অর্থে তৈরি করা এই অবকাঠামো এখন মানুষের কাজে আসার আগেই নষ্ট হওয়ার পথে। এলাকাবাসীর দাবি, সন্ধ্যা নদীতে স্থাপিত স্থাপনা ফেলে রাখা হয়েছে; সেগুলো দ্রুত পরীক্ষা করে যেগুলো সচল করা সম্ভব, তা দিয়ে ফেরি সার্ভিস চালু করা হোক। আর যেগুলো ব্যবহার করা যাবে না, সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে সরকারি নিয়মে ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলে তাদের দাবি।

২০২২ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীন (সওজ) এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয় উজিরপুর উপজেলা সদরের সাথে গুঠিয়া ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকার যোগাযোগ সহজ করতে। এ জন্য দু’টি ইউটিলিটি টাইপ ফেরি ও পন্টুন স্থাপন করা হয়। এত টাকা খরচ করে ফেরি এনে ব্যবহার না করায় এর সুফল থেকে মানুষজন বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে করে সংশ্লিষ্ট এলাকার অধিবাসীরা ক্ষুব্ধ। কারণ, ফেরি সার্ভিস চালু হলে স্থানীয়দের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি উজিরপুরের সাথে বানারীপাড়া, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের যোগাযোগে সময় ও দুর্ভোগ দুই কমত; এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়। তবু কেন ফেরি সার্ভিস চালু করা হচ্ছে না, সেটি এলাকাবাসীর বড় প্রশ্ন। বাস্তবে নদীভাঙনের অজুহাতে ফেরি সার্ভিস চালু না করা একটি খোঁড়া যুক্তি। এই প্রকল্প নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে— প্রকল্প হাতে নেয়ার আগে কেন সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি? উল্লিখিত স্থানে স্থাপনা নির্মাণ টেকসই হবে কি না? সঙ্গত কারণে অবকাঠামো নির্মাণের পর তা ফেলে রাখায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— আসলেই কি এটি জনস্বার্থে নেয়া হয়েছিল, নাকি প্রকল্পের নামে অর্থ লোপাট করা ছিল উদ্দেশ্য? এটি কি সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বেচ্ছাচারিতা নয়?

আমরা মনে করি, যেহেতু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, তাই যত দ্রুত সম্ভব উজিরপুরে সন্ধ্যা নদীতে ফেরি সার্ভিস চালুর ব্যবস্থা নেয়াই এখনকার কর্তব্যকাজ। অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রেখে সরকারি সম্পদ নষ্ট করার কোনো মানে নেই।