দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম জায়গা। কিন্তু জেলা পর্যায়ে মানুষ কিছুটা চিকিৎসাসেবা পেলেও উপজেলা পর্যায়ে বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। এর অন্যতম কারণ চিকিৎসক সঙ্কট।

একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালে প্রায় সাড়ে সাত হাজার চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে চার হাজার পদ খালি। শতকরায় যা প্রায় ৫৩ শতাংশ। পদে না থাকা চিকিৎসকদের একটি অংশ উচ্চশিক্ষায় ঢাকাসহ অন্যত্র যুক্ত থাকেন। পাশাপাশি আরেক দল রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শহরে বদলি হন।

গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২০ মার্চ পর্যন্ত প্রায় আট মাসে ৬ হাজার ৫৫৬ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ কর্মস্থলে যোগদান করলেও পাঁচ শতাধিক চিকিৎসক যোগদান করেননি। অথচ তাদের বেশির ভাগের পদায়ন উপজেলা হাসপাতালে।

চিকিৎসা আর দশটা পেশা থেকে আলাদা। এখানে আয়েশিভাবে সেবা দেয়ার সুযোগ নেই। সুযোগ নেই সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকার। একজন চিকিৎসককে দিন-রাত একাকার করে রোগীর সেবা করতে হয়। সব শ্রেণীর মানুষকে চিকিৎসা দিতে হয়। ফলে যখন কেউ মেডিক্যাল শিক্ষা শেষে সরকারি চিকিৎসাসেবায় নিযুক্ত হন; তখন তার বিষয়ে সরকারের ভিন্নরকম নীতি থাকা প্রয়োজন।

উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকরা যেতে চান না এমন অভিযোগ নতুন নয়, বেশ পুরনো। চিকিৎসকদের সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সেগুলোর সমাধান করলে গ্রামাঞ্চলের চিকিৎসক সঙ্কট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক সঙ্কটের কারণ ও সমাধান নিয়ে গত বছর বিশ্বের প্রভাবশালী চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। এটি করেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক বিএসএমএমইউ) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের ছয়জন শিক্ষক এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল সেবাব্যবস্থাপনা শাখার এক কর্মকর্তা।

এতে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলের চিকিৎসকদের ১৮ ধরনের সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ চিকিৎসকদের নিরাপত্তার অভাব, আবাসন সমস্যা, কাজের নোঙরা পরিবেশ, প্রভাবশালীদের চাপ, সরকারের নীতি-সম্পর্কিত সমস্যা, সন্তানদের পড়াশোনায় ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব প্রভৃতি। এসব কারণে চিকিৎসকরা গ্রামাঞ্চলে যেতে চান না। গেলেও থাকতে চান না। ল্যানসেটে প্রকাশিত এসব সমস্যা পুরনো হলেও এগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান এখনো করা সম্ভব হয়নি। ফলে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা দিতে চিকিৎসকদের উন্নাসিকভাব রয়েছে। যেহেতু বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার, ক্যাডার সার্ভিসের অন্যান্য ক্যাডার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, সেহেতু স্বাস্থ্য ক্যাডারের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের বিষয়গুলো ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ রয়েছে। সেই সাথে চিকিৎসকদের গ্রামাঞ্চলে থেকে চিকিৎসাসেবা দিতে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা দরকার।

সরকার দেশের স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে কমিশন গঠন করেছে। এ সংস্কারে উপজেলা কিংবা গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকদের সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো সমাধানের বিষয়ে পরামর্শ থাকবে, আশা করা যায়।

আমরা যদি উপজেলা কিংবা গ্রামাঞ্চলের চিকিৎসার মান বাড়াতে পারি, দিতে পারি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ আর চিকিৎসাসেবা পেতে ঢাকামুখী হবে না। উপজেলা পর্যায়ে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে এমনটা আমাদের প্রত্যাশা।