বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার আলোচিত অনেক স্থলসীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়েছে; কিন্তু ফেনীর মুহুরীর চর সীমান্ত সমস্যাটি দীর্ঘদিন থেকে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ওই এলাকায় বাংলাদেশের জমির মালিকরা নিজেদের জমিতে যেতে পারছেন না, সুকৌশলে বাংলাদেশীদের জমি দখলে নিচ্ছে ভারতীয়রা। সেই সাথে ফেনীর সীমান্তবর্তী এ এলাকা এখন অনুপ্রবেশকারী, চোরাকারবারি, মাদকপাচার ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। এমতাবস্থায় মুহুরীর চর সীমান্ত সমস্যাটি আর জিইয়ে রাখা সমীচীন নয়। ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে সমস্যার সমাধান করা দরকার।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, মুহুরীর চরের আয়তন ৯২.১৪ একর। ২০১১ সালের স্থলসীমান্ত প্রটোকলের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের অংশ ৭১ দশমিক ৯৪ একর এবং ভারতের অংশ ২০ দশমিক ২০ একর। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে দুই দেশের জরিপ বিভাগ মুহুরীর চরে যৌথ জরিপ পরিচালনা করে। এর আগে ২০১০-১১ জরিপ মৌসুমেও যৌথ জরিপের মাধ্যমে ইনডেক্স ম্যাপ প্রস্তুত করা হয়। তবে স্থানীয় পর্যায়ে চরের জমির দখল ও ব্যবহার নিয়ে দেখা যায় ভিন্ন বাস্তবতা। স্থানীয়দের অনেকের দাবি, চরের মোট আয়তন ৯২ দশমিক ১৪ একরের মধ্যে প্রায় ৩১ দশমিক ১৮ একর বাংলাদেশের দখলে, আট একর ভারতের দখলে এবং বাকি ৫২ দশমিক ৯৬ একর জমি এখনো অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে। অমীমাংসিত এলাকায় যৌথ জরিপ চালিয়ে ৪৪টি খুঁটি স্থাপন করে সীমানা চিহ্নিত করা হয়। দুই দেশের সরকারের সম্মতি পেলে সেখানে পাকা সীমান্ত পিলার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে সীমান্তের এই অংশের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এর ফলে কাগজপত্রে মালিকানা থাকলেও নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করতে যেতে পারছেন না বাংলাদেশের জমির মালিকরা। ভূকৌশলগত কারণে মুহুরীর চর স্পর্শকাতর জায়গা। যে কারণে ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৯ সালের ২২ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিএসএফ ও তৎকালীন বিডিআরের মধ্যে ৫৮ দিন গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। ১৯৯৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশের বাউর পাথর গ্রামের একজন নিহতও হন। এ ছাড়াও বহু বাংলাদেশীও আহত হন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— সীমান্তের জমিগুলো ভারত কৌশলে দখলে নিচ্ছে। ভারতের অংশে নদীভাঙন ঠেকানোর নামে গ্রোয়েন ও অন্যান্য নদী নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ করে মুহুরী নদীর গতিপথ পরিবর্তন করেছে। নদী এখন পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরে এসে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করেছে এবং চর সৃষ্টির ধরনও পাল্টে গেছে। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের আলোচনায় মুহুরী নদীর মধ্যস্রোতকে সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়; কিন্তু নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে মাঠপর্যায়ে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। অতীতে ভারতের সাথে নানা সীমান্তবিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে; কিন্তু গত আওয়ামী লীগ সরকার মুহুরীর চর সীমান্ত সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। সমস্যা জিইয়ে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাংলাদেশকে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। মুহুরীর চরের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।