গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশ ও রক্ষার অন্যতম প্রধান উপাদান গণমাধ্যম। সে কারণে একে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। এ দিকে আমরা একটি ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক অবস্থায় রয়েছি। একে গড়ে তোলার আশার বাণী শোনাচ্ছে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের ব্যবধানে বিজয় পাওয়া বিএনপি সরকার। ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও বাস্তবে গণমাধ্যমের উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। সংবাদপত্র শিল্প আছে সবচেয়ে বড় সঙ্কটে। বিগত সরকারের অনিয়ম ও স্বজন তোষণের নীতি এ খাতে যে ক্ষত তৈরি করেছে, তা সারিয়ে একে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ইতিবাচক উদ্যোগ দরকার। অন্ততপক্ষে সরকারি বিজ্ঞাপন নীতিমালায় যে অনিয়ম বিদ্যমান আছে, তা সংস্কারের উদ্যোগ এখনো নেয়া হয়নি।

পত্রিকাগুলো এখনো ২০১৩ সালে নির্ধারিত হারে সরকারি বিজ্ঞাপন পায়। অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতিতে বিগত ১৩ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহু গুণ। এর মধ্যে সরকার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করেছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সর্বোচ্চ গ্রেডের একজন কর্মকর্তা এখন এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা বেতন পাবেন। এ দিকে কাগজ, কালি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও অফিস ভাড়াসহ একটি পত্রিকা ছাপানোর যত আনুষঙ্গিক খরচ— সব বেড়েছে কয়েকগুণ। এ অবস্থায় সংবাদকর্মীদের উপযুক্ত বেতন দেয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে কোনোরকমে পত্রিকা বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

সংবাদপত্রের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের ওপর আমদানি শুল্ক ও উচ্চহারে ভ্যাট অব্যাহত আছে। করপোরেট কর, বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর উৎসে করসহ আরোপিত অন্যান্য কর ও ভ্যাট কমাতে সংবাদপত্রের মালিক সংগঠন নোয়াবের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছিল। তবে বাজেটে সেই দাবি উপেক্ষিত হয়েছে। এ অবস্থায় সংবাদপত্র রীতিমতো অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পুরনো বৈষম্যমূলক বিজ্ঞাপন নীতিমালাও খড়গ হিসেবে মাথার উপর আছে।

সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপন বিলির ক্ষেত্রে কোনো আদর্শ নীতি অনুসরণ করে না। এই কম দরের সরকারি বিজ্ঞাপনও ন্যায্য বণ্টন করা হয় না। ফলে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর-ডিএফপির তালিকায় থাকা প্রথম সারির অনেক পত্রিকা এ থেকে বঞ্চিত হয়। একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীনদের সমন্বয়ে অশুভ চক্র সরকারি বিজ্ঞাপন বিলি-বণ্টনে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর সুযোগ নেয় আন্ডারগ্রাউন্ড কিছু পত্রিকা। বিগত সরকারের সময়ের পুরনো সংস্কৃতি এ ক্ষেত্রে এখনো অনেকাংশে কার্যকর আছে। সংবাদপত্র বিকাশে সহযোগিতার বদলে সরকার যেন একধরনের বৈরী অবস্থান নিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের উত্থানের পেছনে পেশাদার গণমাধ্যমের অনুপস্থিতি প্রধান কারণ ছিল। বিএনপি নিজে এ ধরনের উগ্র শাসনে বারবার পিষ্ট হয়েছে। এখন দলটির সবচেয়ে ভালো সময়। চাইলে একটি পেশাদার গণমাধ্যম গড়ে তোলার পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে। এ জন্য প্রথমে সংবাদপত্রের প্রকাশনা সহজ করতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। যত ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স আছে সেগুলো তুলে না নিলেও কমাতে হবে। বিজ্ঞাপনের হার সময়োপযোগী করার পাশাপাশি ন্যায্য বণ্টনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মোট কথা, সরকারকে সংবাদপত্র টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আনুকূল্য দিতে হবে।