বাংলাদেশে গত সাড়ে ১৫ বছরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকার অন্যতম সহযোগী ছিল ভারত। দিল্লির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশে এক দিকে যেমন স্বৈরশাসন চালিয়ে গেছেন, তেমনি নানা অপকর্মের সহযোগী হয়েছেন। এমন একটি গুরুতর অপকর্ম ছিল বাংলাদেশীদের গুম করা। গুমের শিকার ব্যক্তিদের কাউকে মেরে ফেলা হয়েছে। কাউকে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীতে কর্মরত শেখ হাসিনার আস্থাভাজন খুনি সদস্যরা বাংলাদেশীদের গুম করে ভারতীয় পুলিশের হাতে তুলে দিত। তারপর তাদের ওপর চলত অকথ্য নির্যাতন।

গত শনিবার নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গুমের শিকার হয়ে ফিরে আসা এক ব্যক্তির বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, তাকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গুম করার পর বেদম নির্যাতন চালিয়েছে। এরপর ভারতের পুলিশের কাছে তুলে দিলে পাসপোর্ট ছাড়া কলকাতায় নিয়ে জেলে রাখা হয়। সেখানেও চলে দফায় দফায় নির্যাতন। সাড়ে তিন মাস রাখা হয় কলকাতা কারাগারে। ভারতের আরেকটি জেলখানায় নিয়েও চালানো হতো নির্যাতন। পরে পুশইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫০ জনের বেশি ব্যক্তির খোঁজ এখনো মেলেনি। গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী কিংবা ছাত্রশিবির নেতা ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস জীবিত আছেন কি না জানে না তাদের পরিবার।

গুমবিষয়ক কমিশন বলছে, বাংলাদেশীদের গুমে ভারত জড়িত ছিল। গুম কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এটি স্পষ্টত প্রতীয়মান হয়, দুই দেশের সরকার এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল’। কমিশন গুমে ভারতের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেলেও এ ঘটনায় কাজ করা তাদের এখতিয়ারবহিভর্ূত বলে জানিয়েছে। তাই বলে কি গুমে জড়িত ভারত কোনো আইনের মুখোমুখি হবে না? বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার একধরনের নীরবতা পালন করছে, যা কাম্য নয়। ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গুমে ভারতের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বৈশ্বিক ফোরামে তুলে ধরতে হবে। একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন করে ভারতকে আইনের আওতায় আনা আবশ্যক। এ বিষয়ে ড. ইউনূস সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া এখন সময়ের দাবি। একই সাথে এখনো নিখোঁজ বাংলাদেশীরা ভারতের কোথাও আছেন কি না তারও অনুসন্ধান জরুরি।

হাসিনা জমানায় গুম বাংলাদেশীদের কাছে ছিল এক আতঙ্কের নাম। যারা গুমের শিকার হয়ে আর ফিরে আসেননি তাদের পরিবারে বিষয়টি গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। কমিশন গুম বন্ধে যেসব সুপারিশ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশ থেকে গুমের সংস্কৃতির অবসান হবে কি না তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে- এই অপরাধের সাথে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাধররা জাড়িত থাকেন। তাই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার সংস্কারসহ বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। রাষ্ট্র সংস্কারে গঠিত কমিশন যেসব বিষয়ে সুপারিশ করেছে সেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামীতে গুম-খুনবিহীন একটি সুন্দর সমাজ গড়ে উঠুক, এটিই সবার প্রত্যাশা।