দুই বছরেও শুরু হয়নি বিচার, থমকে আছে তদন্ত

Printed Edition
back-6
দুই বছরেও শুরু হয়নি বিচার, থমকে আছে তদন্ত

এম জে এইচ জামিল সিলেট ব্যুরো

ক্যালেন্ডারের পাতায় ফের ফিরে এসেছে ১৮ জুলাই। ২০২৪ সালের এই রক্তঝরা দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সিলেটের মাটিতে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) মেধাবী শিক্ষার্থী রুদ্র সেন। আজ তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দুই বছর আগে ঠিক এই দিনে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল দিনাজপুর সদর উপজেলার সুবীর সেন ও শিখা বণিক দম্পতির একটি সাজানো সংসারের সব স্বপ্ন। দুই বছর পর দিনটি আবার ফিরে এসেছে; কিন্তু রুদ্র আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। আজও চোখের জলে পুত্রকে স্মরণ করে বুকফাটা আর্তনাদ করছেন তার বাবা-মা। একমাত্র বোন সুস্মিতা সেনও আজ পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেননি তার প্রিয় ছোট ভাইটিকে। এ দিকে রুদ্র সেনের মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হলেও তার হত্যাকাণ্ড মামলার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তদন্তের চক্রেই বন্দী হয়ে আছে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া। মামলার এই চরম ধীরগতিতে নিহতের পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তার সহযোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর হতাশা বিরাজ করছে।

সে দিন যা ঘটেছিল : ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের শাহাদতকে কেন্দ্র করে যখন সারা দেশ উত্তাল, ঠিক তখন শাবি ক্যাম্পাস ও এর আশপাশের প্রতিটি কর্মসূচিতে রুদ্র সেন ছিলেন সম্মুখসারির অগ্রসৈনিক। আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হওয়ায় তিনি তৎকালীন স্বৈরাচারী শক্তির টার্গেটে পরিণত হন।

১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রঘোষিত অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে শাবিপ্রবির প্রধান ফটকের পাশে সুরমা আবাসিক এলাকায় পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে হামলা ও গুলিবর্ষণ করে। এতে বহু আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহত হন। হামলার একপর্যায়ে ধাওয়া খেয়ে আহত অবস্থায় রুদ্র সেন সুরমা আবাসিক এলাকা ও বাগবাড়ী এতিম স্কুলের রাস্তার সংযোগস্থলে একটি খালে ভেলায় চড়ে পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ভেলাটি উল্টে গেলে তিনি পানিতে পড়ে যান। সাঁতার না জানা রুদ্র বাঁচার আকুতি জানালেও আসামিরা তাকে উদ্ধার করতে দেয়নি; বরং পরিকল্পিতভাবে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা: শামসুল ইসলাম ময়নাতদন্ত শেষে রুদ্রের পানিতে ডুবে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

ধাপে ধাপে তদন্ত সংস্থা বদল, অধরাই মূল আসামিরা : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর ১৯ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক হাফিজুল ইসলাম।

মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সিলেট সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, শাবিপ্রবির তৎকালীন ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, সিলেট মহানগর পুলিশের তৎকালীন উপ পুলিশ কমিশনার আজবাহার আলী শেখ ও অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার সাদেক কাউসার দস্তগীরসহ ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করে আরো ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। আদালতের নির্দেশে মামলাটি প্রথমে তদন্ত শুরু করে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। এরপর সেটি স্থানান্তর করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই)। সর্বশেষ গত বছর মামলাটির দায়িত্ব দেয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)। বর্তমানে সিআইডি এর তদন্ত করছে। তবে বারবার তদন্ত সংস্থা পরিবর্তনের কারণে মামলার মূল অগ্রগতি থমকে গেছে।

পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয় ও বাদির বক্তব্য : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো: মোখলেছুর রহমান গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের প্রিয় শিক্ষার্থী রুদ্র সেন হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা রীতিমতো হতাশ। দুই বছরেও মামলার কোনো অগ্রগতি নেই, মূল আসামিদের কাউকেই গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। মামলার শুরুর দিকে তদন্ত কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখলেও গত এক বছর ধরে কেউ কোনো যোগাযোগ করছেন না।’ মামলার বাদি হাফিজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সিআইডির সাথে যোগাযোগ করলে তারা শুধু বলে যে, পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হচ্ছে। সিআইডি পাঁচ আসামিকে গ্রেফতারের দাবি করলেও বাস্তব চিত্র হলো- তাদের অন্য মামলায় গ্রেফতার করে এই মামলায় শুধু গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই মামলার কোনো আসামিকে সরাসরি গ্রেফতার করা হয়নি।’

সিআইডি পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো: এমরান হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘রুদ্র সেন হত্যা মামলাটির অধিকতর তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মামলাটি কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে, তাই একটু সময় লাগছে। এজহারনামীয় বেশির ভাগ রাজনৈতিক আসামি দেশের বাইরে পলাতক। এখন পর্যন্ত এজহারনামীয় চারজনসহ মোট পাঁচজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যারা শাবি শিক্ষার্থী। তবে চার্জশিট কবে দেয়া হবে, সে বিষয়ে এখনই সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’