কতটা সফল ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ

Printed Edition

আশিকুর রহমান

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০২৬ বিশ্বকাপকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন’ হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত প্রথম ৪৮ দলের বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত নাটকীয় ম্যাচ, নতুন নিয়ম, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং রেকর্ডসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতির মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তবে টুর্নামেন্টটি প্রত্যাশা পূরণ করেছে কি না, সে প্রশ্ন এখনো বহাল রয়েছে।

এবারই প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয় ৪৮টি দল। কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্দান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ পায়। বিশেষ করে মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে স্পেন ও উরুগুয়ের সাথে ড্র করে নকআউট পর্বে উঠে ইতিহাস গড়ে। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিলেও আফ্রিকান দেশটির লড়াই টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক হয়ে থাকে।

তবে দল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। গ্রুপ পর্বে ৭২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলেও বিদায় নেয় মাত্র ১৬টি দল। আবার তৃতীয় স্থান অর্জনকারী আটটি দল নকআউটে ওঠার সুযোগ পাওয়ায় কিছু ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা কমে যায়। অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ের মতো কয়েকটি দল ড্র করেই পরের পর্ব নিশ্চিত করে।

এবারের বিশ্বকাপে নতুন বাছাই পদ্ধতিও আলোচনায় ছিল। শীর্ষ চার দল- আর্জেন্টিনা, স্পেন, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে নকআউট পর্বের ভিন্ন ভিন্ন অংশে রাখা হয়, যাতে তারা শুরুতেই মুখোমুখি না হয়। একই সাথে আর্জেন্টিনা ও স্পেনকে সম্ভাব্য ফাইনাল পর্যন্ত আলাদা রাখতে গ্রুপ বিন্যাসেও পরিবর্তন আনা হয়। এতে নকআউটের সম্ভাব্য সূচি বদলে যায় এবং ফাইনালের পথও নতুনভাবে তৈরি হয়।

সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের হাইড্রেশন বিরতি। ফিফা খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের কথা বললেও অনেকের মতে, এই বিরতি মূলত সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের সুযোগ বাড়িয়েছে। বিরতির সময় কোচদের কৌশল বদলের সুযোগও মিলেছে, যা অনেক ম্যাচের গতিপথে প্রভাব ফেলেছে। তবে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা নিজেদের প্রতিযোগিতায় এমন নিয়ম চালু করবে না।

রেফারিংয়েও পরিবর্তন আনে ফিফা। প্রধান রেফারি কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনা সময় নষ্ট রোধে থ্রো-ইন, গোলকিক, বদলি ও অযথা খেলা বন্ধ করার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। এর ফলে ম্যাচের মোট সময় কমলেও বল খেলার সময় কিছুটা বেড়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপে গড়ে বল মাঠে ছিল ৫৮ মিনিট ৩ সেকেন্ড, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৫৮ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। একই সাথে অপ্রয়োজনীয় বিলম্বও কমেছে।

ভিডিও সহকারী রেফারি (ভিএআর) নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গ্রুপ পর্বে প্রযুক্তির ব্যবহার তুলনামূলক সফল হলেও নকআউটে কয়েকটি সিদ্ধান্ত বিতর্ক তৈরি করে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গোল বাতিল হওয়ার ঘটনায় তদন্ত দাবি করে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। যদিও সামগ্রিকভাবে ভিএআর সিদ্ধান্ত দ্রুত হওয়ায় অনেকের মতে, ঘরোয়া লিগগুলোর তুলনায় বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি কার্যকর ছিল।

মাঠের বাইরেও ছিল রাজনৈতিক বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণনীতির কারণে কয়েকটি দেশের সমর্থক ও কর্মকর্তারা প্রবেশে জটিলতার মুখে পড়েন। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দেয়া এবং ইরান দলের ওপর কঠোর ভ্রমণ বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্ম দেয়। সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইংল্যান্ডের ফরোয়ার্ড বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে ফিফার সাথে যোগাযোগ করেন। পরে শাস্তি স্থগিত হওয়ায় ফিফার স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

উচ্চ টিকিট মূল্য নিয়েও সমালোচনা ছিল। তবে দর্শক উপস্থিতিতে তার প্রভাব পড়েনি। কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে ফিফা জানায়, স্টেডিয়ামগুলোর গড় দর্শক উপস্থিতি ছিল ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ম্যাচগুলোতে মোট ৬৫ লাখের বেশি দর্শক উপস্থিত ছিলেন, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ যেমন নতুন দেশের উত্থান, নাটকীয় ম্যাচ এবং দর্শক উপস্থিতির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তেমনি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নতুন নিয়ম এবং আয়োজক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও এই আসরের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।