সতর্কবার্তা নেই খাবারের মোড়কে, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য
Printed Edition
- অস্বাস্থ্যকর খাবারের থাবা
- এফওপিএল বাস্তবায়নের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
রঙিন মোড়কে সাজানো বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, কোমল পানীয় কিংবা প্যাকেটজাত জুস এখন দেশের অধিকাংশ মানুষের নিত্যদিনের খাদ্যাভ্যাসের অংশ। কিন্তু এসব অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ক্ষতিকর চর্বির উপস্থিতি বাড়িয়ে দিচ্ছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোক্তাদের সচেতন করতে প্যাকেটের সামনের অংশে সহজবোধ্য স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা বা ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) চালু করা এখন সময়ের দাবি। তবে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও শিল্পখাতের চাপের কারণে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। বর্তমানে বিশ্বের ৪৪টি দেশে এই পদ্ধতি চালু রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশেও অসংক্রামক রোগ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যান, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশ অকাল মৃত্যু। এ ছাড়া দেশে প্রায় এক কোটি ৩৯ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’ অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ দেশের শীর্ষ অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে।
কী এই এফওপিএল?
ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে সহজ ভাষা বা প্রতীকের মাধ্যমে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, সম্পৃক্ত চর্বি বা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম কার্যকর ও সাশ্রয়ী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করে।
বর্তমানে বাংলাদেশে পুষ্টিগুণের তথ্য সাধারণত মোড়কের পেছনে ছোট অক্ষরে ও জটিল সংখ্যায় লেখা থাকে, যা অধিকাংশ ভোক্তার পক্ষে বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ৪৬ শতাংশ পণ্যে সম্পৃক্ত চর্বি (স্যাচুরেটেড ফ্যাট) এবং ৩৮ শতাংশ পণ্যে ট্রান্স ফ্যাট সংক্রান্ত তথ্যই উল্লেখ থাকে না।
প্যাকেটজাত খাবারের বাড়তি ঝুঁকি
২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ করেন। গবেষণাগারে পরীক্ষা করা ১০৫টি অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মধ্যে ৬৩ শতাংশে অতিরিক্ত সোডিয়াম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কিছু লজেন্স, ডালভাজা ও অন্যান্য স্ন্যাকসে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি চিনি ও ক্ষতিকর চর্বি পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোক্তারা যখন ঝুঁকির বিষয়টি না জেনেই এসব খাবার কিনছেন, তখন জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের ৪৪ দেশে কার্যকর
বর্তমানে বিশ্বের ৪৪টি দেশে কোনো না কোনো ধরনের এফওপিএল ব্যবস্থা চালু রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, চিলি, মেক্সিকো ও উরুগুয়ের মতো দেশে বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ লেবেল চালুর পর অস্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চিলিতে চিনিযুক্ত খাদ্য ক্রয় প্রায় ২০ শতাংশ এবং অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত খাদ্য ক্রয় ১৪ শতাংশ কমেছে। উরুগুয়েতে ৫৮ শতাংশ ভোক্তা সতর্কবার্তা দেখে খাদ্য কেনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন।
বাংলাদেশে কোথায় আটকে আছে?
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। এতে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাদ্যের মোড়কের সামনে কালো অষ্টভুজাকৃতির সতর্কবার্তা ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি খসড়াটি জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, শিল্পখাতের লবিং ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রবিধানটি বাস্তবায়নে বিলম্ব হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমাতে এ নীতিমালার দ্রুত অনুমোদন জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মত
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, খাদ্যের পেছনে লেখা জটিল পুষ্টিতথ্য সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। তাই মোড়কের সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তা সহজেই বুঝতে পারবেন খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা চর্বি রয়েছে কি না। এতে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ কমবে এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। আবার অতিরিক্ত চিনি ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে। এফওপিএল চালুর বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা হয়েছে এবং বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট আবু আহমেদ শামীম বলেন, এফওপিএল ভোক্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জানায় এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচন সহজ করে। তার মতে, শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ কমাতে এবং অভিভাবকদের সচেতন করতে এ ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল চালুর ফলে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত এই ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।