মাটির কুস্তি থেকে এশিয়ান গেমসে

Printed Edition
khela-2
এশিয়ান গেমসের ক্যাম্পে দুই কুস্তিগীর মাহবুব ও সাত্তারের মাঝে কোচ শিরিন সুলতানা : নয়া দিগন্ত

ক্রীড়া প্রতিবেদক

মো: মাহবুব আলম। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে জন্ম। আরেকজন আবদুস সাত্তার। বাড়ি কুমিল্লার মেঘনায়। উভয়েই উঠে এসেছেন কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহি মাটির কুস্তি থেকে। জায়গা করে নিয়েছেন জাপানে হতে যাওয়া এবারের এশিয়ান গেমসে। কুস্তি ইভেন্টে ৬১ কেজিতে লড়বেন মাহবুব এবং ৬৫ কেজিতে লড়বেন সাত্তার।

কুস্তির কোচ শিরিন সুলতানা একজন মেয়ে বলে অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি। দুই পুরুষ কোচের জন্য নারী কোচ নিয়োগ নিয়ে আগে পিছে আলোচনা সমালোচনাও হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হকের সুদুরপ্রসারি চিন্তা ভাবনা, বিওএর আধুনিক মানসিকতা এবং ফেডারেশনের ইচ্ছায় শিরিন কোচের পদেই বহাল রইলেন। দুই শিষ্য মাহবুব ও সাত্তার জানালেন, ‘কোচ পুরুষ নাকি নারী সেদিকে দেখার কি আছে। তিনি অতীতে খেলেছেন, আন্তর্জাতিক পদক এনেছেন, কোচেস কোর্স করেছেন, এখন আমাদের কোচ হয়েছেন। ওনার যোগ্যতা আছে, শিখতে পারছি-আমাদের তো এটিই দরকার।’

শিরিন জানালেন, ‘এত বড় গেমসের আগে এক মাসও অনুশীলন হচ্ছে না, এটি দুঃখজনক। অথচ পাশের দেশগুলোতে এক-দুই বছর আগ থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা কম সময়ে বেশি ফল আশা করি। পদক জেতার স্বপ্ন দেখি। অভিজ্ঞতার আলোকে যা অনুশীলন হচ্ছে, এটুকু বলতে পারি, ছেলেরা তাদের ক্যাটাগরিতে ভালো খেলবে। এতটুকুন প্র্যাকটিসে আহামরি সাফল্য আশা করাটা ঠিক হবে না। অংশগ্রহণ করাটাই বড়। ছেলেরা একটি বিশাল আসর দেখবে, শিখবে, ভবিষ্যতের প্রেরণা পাবে।’

বিদেশে যাওয়ার নাম শুনলে চোখ চিকচিক করে উঠে ক্রীড়াবিদদের। ব্যতিক্রম দেখা গেল দু’জনের কথাবার্তায়। নরম সুরেই জানালেন, বিদেশ গিয়ে দেশের জন্য যদি ভালো খেলতে না পারি, পদক জিততে যদি না পারি, পোডিয়ামে লাল-সবুজের পতাকা যদি ওড়াতে না পারি, জাতীয় সঙ্গীত বাজাতে না পারি তাহলে বিদেশ তো অর্থহীন। ফেডারেশন থেকে আমাদের সিলেক্ট করা হয়েছে কুস্তি খেলার জন্য। আমরা যাচ্ছি খেলতে। ঘুরতে তো যাচ্ছি না।

একই চিন্তাভাবনা মাহবুব ও সাত্তারের। জানালেন, ‘এশিয়ান গেমস বিশাল ব্যাপার, সেরা সেরা ক্রীড়াবিদের আনাগোনা। নিজেদের ইভেন্টে অন্তত সেরা খেলাটাই খেলতে চাই। হারার আগের হার নয়। শেষমুহূর্ত পর্যন্ত লড়তে চাই। বড় বড় প্রতিযোগী থাকবে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তার পরও সামর্থ্যরে শেষ বিন্দু দিয়ে লড়তে চাই।’

২০১৮ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ে ৬১ কেজিতে একটানা স্বর্ণ জিতে চলেছেন মাহবুব। নিজের সাফল্যের রহস্য জানালেন তিনি, ‘২০১৬ সালে যখন কুস্তিতে আসি তখন ৫৭ কেজিতে খেলতাম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে দুবার হারের পর নিজের ভেতরেই জেদ চাপে। নিজের ভিডিও দেখে ভুলগুলি শুধরানোর পর থেকেই সাফল্য। তাছাড়া ইতালিয়ান ফ্রাঙ্কস সামিজো আমার প্রিয় কুস্তিগির। উনি ডিফেন্সিভ খেলতে পছন্দ করেন। তাকে ফলো করেই এ অবস্থানে এসেছি।’

গেছেন ইংল্যান্ড, ইরান, কিরগিজস্তান ও ভারত। সাফল্য বলতে ২০১৮ সালে ইরানে পাকিস্তানকে হারিয়ে তৃতীয় এবং ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে জিপি গ্র্যান্ড ফিক্সে চতুর্থ। বাবা মো: আফজাল হোসেন কুস্তিগির ছিলেন। নিজে জাতীয় দলে খেলতে পারেননি বিধায় ছেলেকে দিয়ে সে সাধ পূর্ণ করেন।

আব্দুস সাত্তারের কুস্তিতে পথচলা অবশ্য ২০২৩ সাল থেকে। ৬৫ কেজি ক্যাটাগরিতে তখন থেকেই গোল্ড। দু’বার দেশের বাইরে গেলেও যুৎসই কিছু হয়নি। গত বছর পাকিস্তানে সাফ হবে বলে ক্যাম্পে ছিলেন। এবার এশিয়ান গেমসে ভালো কিছু করবেন বলেই তার বিশ^াস।

কুস্তি ফেডারেশনের সহসভাপতি হাসানুজ্জামান খান বাবুল জানান, আমি যেখানে আছি, সেখানে কোন অন্যায় হতে দেবো না। যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ হবে। আমি একজন সংগঠক। বহু কিছুই আমার নখদর্পণে। ছেলেদের কোচ মেয়ে হতে পারবে না, এমন কোনো নীতি ওআইসি অলিম্পিকে নেই। বিভেদ আমরাই সৃষ্টি করছি। শিরিনকে পরখ করার কিছু নেই। কুস্তিতে কোচ হওয়ার জন্য তার যথেষ্ট যোগ্যতা রয়েছে। আর যে দু’জন মাহবুব ও সাত্তারকে সিলেক্ট করা হয়েছে তারা তাদের ক্যাটাগারির মাঝে সেরা। দীর্ঘমেয়াদে প্রশিক্ষণ হলে ভালো হতো; যেকোনো কারণে সেটি হয়নি। অনুশীলনে যা দেখলাম, তাতে আমার বিশ্বাস তারা ভালো করবে।