ইরানে কঠোর আঘাত হানার নতুন হুমকি ট্রাম্পের
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের ওপর নতুন করে ‘কঠোর’ আঘাত হানার হুমকি দিেেয়ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর দেশ দু’টির মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এ হুমকি দেন ট্রাম্প। এ দিকে ইরানের অর্থনীতি আরো দুর্বল করার জন্য চাপ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।
এনবিসি নিউজ জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পেরিয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখেছে ইরান। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে পাল্টা অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।
গত রোববার ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় তেহরান। পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর জবাব দেয়ার হুমকি দিলেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজের এক সাংবাদিকের সাথে সংক্ষিপ্ত আলাপে ট্রাম্প বলেন, আমরা তাদের (ইরান) ওপর কঠোর আঘাত হানবো। দেশটিকে জবাব দেয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে ইরান যাতে আর মাইন পেতে রাখতে না পারে, সে জন্যই লারাক দ্বীপে ইরানের রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থায় হামলা চালানো হয়েছে। জবাবে জর্দান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। তেহরান বলেছে, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত সোমবার দিনের শেষে উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানে এক সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, আমরা সমঝোতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার পথ খুঁজছি। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ইরান কিংবা এ অঞ্চলের কারো জন্য মঙ্গলজনক নয়। ইরানের প্রেসিডেন্টের ভাষ্যমতে, বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের উপায় হলো সংলাপ ও সহযোগিতা।
তবে যুক্তরাষ্ট্র জুনের চুক্তিতে ফিরে এলে ইরানও ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ পাল্টা পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। মঙ্গলবার কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমি স্পষ্টভাবে বলছি, যুক্তরাষ্ট্র যদি উল্লিখিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় তার প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসে, তাহলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানও তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা পদক্ষেপ নেবে।’ কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেক থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। তাদের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ওই সমঝোতা স্মারক করা হয়েছিল। কয়েক মাস ধরে চলা তেহরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্ঘাত অবসানের জন্য এটি করা হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে সঙ্ঘাত শুরু হয়। ওই হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। পরে চুক্তিটি ভেঙে যায়। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের জন্য উভয়পক্ষ পরস্পরকে দায়ী করে।
পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। এক মাসের বেশি সময় ধরে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর সোমবার দুই দেশ আবারো পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করে। তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ রেখেছে। তবে তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রও একই পদক্ষেপ নিলে চুক্তির আওতায় তারা হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়াসহ নিজেদের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে যাবে।
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের প্রতিশ্রুতিতে এবং তাদের প্রেসিডেন্ট যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, তাতে ফিরে আসতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে সবকিছু আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
সঙ্ঘাত প্রসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাকাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমেরিকা আলোচনার নামে নিজেদের সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করছে, যা ইরানের ক্ষেত্রে কখনোই কাজ করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ইসলামাবাদ স্মারকে স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় হরমুজে নতুন করে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। এ ছাড়া পরমাণু অপ্রসার চুক্তি (এনপিটি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অধিকারবঞ্চিত হলেও ইরান নীতিগতভাবে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের বিপক্ষে। একই সাথে সম্প্রতি পাকিস্তান, সাউদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে ইরান আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করে না। মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ ও নতুন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে উত্তর দিতে গিয়ে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুন নাসের হেম্পাতি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, ইরানের কাছে বিদেশী মুদ্রার পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে। বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইতোমধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০০ কোটি ডলার বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। মুদ্রার মান কিছুটা কমলেও ইরান কোনোভাবেই দেউলিয়া বা চরম মূল্যস্ফীতির মুখে পড়বে না বলে সাফ জানিয়ে দেন তিনি।
২০০টির বেশি বিমান ভূপাতিত করার দাবি
সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরাইলের হামলা চলাকালে ইরানের তৈরি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুদেশের ২০০টিরও বেশি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ইরানের ‘বিমান প্রতিরক্ষা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেশটির সেনা কমান্ডাররা এই তথ্য জানান।
প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলিরেজা এলহামি বলেন, নিজেদের প্রযুক্তিতে তৈরি এসব অস্ত্রের শক্তি এতটাই আধুনিক ও গোপন ছিল যে, শত্রু বাহিনী বুঝতেই পারেনি ঠিক কোন ব্যবস্থা থেকে তাদের বিমানে আঘাত হানা হয়েছিল। ইরানি সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, দেশের আকাশসীমা নিরাপদ রাখতে মরুভূমি, সমুদ্র উপকূল, পাহাড়ি অঞ্চল ও দ্বীপসহ প্রায় তিন হাজার ৮০০টিরও বেশি দুর্গম স্থানে তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সতর্কাবস্থায় বসানো রয়েছে। আকাশপথে যেকোনো শত্রুভাবাপন্ন উড়োজাহাজ বা ড্রোন শনাক্ত করা মাত্রই তা ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে এসব ইউনিট। সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মাতৃভূমি রক্ষায় ইরানের মানুষ আগামী ২০ প্রজন্ম ধরে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে সৌদি তেলবাহী ২ জাহাজে হামলা
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বের হওয়ার সময় সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলবাহী দু’টি সুপার ট্যাংকারে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইলের আঘাতের ঘটনা ঘটেছে। শিপিং গোয়েন্দা সংস্থা মেরিস্কস ও কেপলারের তথ্যের বরাতে গতকাল মঙ্গলবার রয়টার্স জানায়, স্থানীয় সময় গত সোমবার গভীর রাতে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পৃথকভাবে এই হামলা হয়। মেরিস্কস জানিয়েছে, ওমানের নৌসীমার করিডরে প্রায় একই সময়ে দু’টি হামলার ঘটনা ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরো অবনতি নির্দেশ করছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হামলার শিকার দুই ট্যাংকারই গত সপ্তাহে সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে ২০ লাখ ব্যারেল করে সৌদি অপরিশোধিত তেলবোঝাই করেছিল। আগস্টে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো হরমুজ প্রণালীর ভেতর থেকে আবারো তেল লোড ও বিক্রি শুরু করে। হামলার প্রথম ঘটনায় সৌদি পতাকাবাহী ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) ‘সিদর’ ওমানের খাসাব বন্দরের প্রায় ১৬ দশমিক ৬ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর কয়েক মিনিট পর লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’ নামের আরেকটি ভিএলসিসি খাসাবের প্রায় ১৭ নটিক্যাল মাইল পূর্বে তিনটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতের শিকার হয়। জাহাজটির সব নাবিক নিরাপদে রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ব্রিটেনের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসও একই এলাকায় হরমুজ প্রণালী থেকে বের হওয়ার সময় একটি ট্যাংকারে তিনটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার খবর জানিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছে। কাতার, ওমানসহ মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে প্রণালীটি আবার স্বাভাবিকভাবে খুলে দেয়ার চেষ্টা হলেও এখন পর্যন্ত তা সফল হয়নি। হামলার পর আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরো হামলার হুমকি দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়ে যায়।