গ্যাসসঙ্কটে দেড় বছর বন্ধ আশুগঞ্জ সার কারখানা

প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে শত শত কোটি টাকার মূল্যবান যান্ত্রিক সরঞ্জাম

Printed Edition

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক ব্রাহ্মণবাড়িয়া

দেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিএল)। অথচ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই সার কারখানাটি গ্যাসসঙ্কটের অজুহাতে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে একরকম অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বন্ধ থাকার ফলে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে শত শত কোটি টাকার মূল্যবান যান্ত্রিক সরঞ্জাম। আমদানিনির্ভরতা বাড়াতে দেশীয় এই শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে; এমন অভিযোগ তুলে কারখানাটি আধুনিকায়ন ও আবার চালুর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৯৮৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে বাণিজ্যিকভাবে ইউরিয়া সার উৎপাদন শুরু করে তৎকালীন ‘আশুগঞ্জ জিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড’। শুরুতে প্রতিদিন এক হাজার ৬০০ টন উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সময়ের ব্যবধানে তা কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১০০ টনে। এটি পূর্ণ সক্ষমতায় সচল রাখতে দিনে প্রয়োজন হয় ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। তবে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় কারখানাটি একের পর এক দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধ রাখা হচ্ছে। সর্বশেষ গত বছরের ১ মার্চ গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ায় কারখানাটির সব ধরনের উৎপাদন থমকে যায়।

বর্তমানে এই কারখানায় উৎপাদিত সার ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের সাতটি কৃষিপ্রধান জেলায় সরবরাহ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন কারখানাটি বন্ধ থাকায় কৃষকের চাহিদা মেটাতে উচ্চ মূল্যে বিদেশ থেকে সার আমদানি করতে হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে দেশের অভ্যন্তরীণ সার খাত পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, ২০১০ সালের পর থেকে একটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী চক্র রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলো বসিয়ে রেখে বিদেশ থেকে সার আমদানির পথ সুগম করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকায় কারখানার জটিল যান্ত্রিক যন্ত্রাংশগুলো ক্রমান্বয়ে কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে। শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের তথ্যমতে, কারখানাটি এখনো আবার চালু করার উপযোগী। যখনই সামান্য সময়ের জন্য গ্যাস পাওয়া যায়, তখনই সীমিত উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হয়। তবে দীর্ঘ বিরতির পর হঠাৎ গ্যাস পেলে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। আর সেই ত্রুটি সারিয়ে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে ফেরার আগেই আবার গ্যাস সংযোগ কেটে দেয়া হয়। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেলে এবং গ্যাস সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হলে এই কারখানাটিকে আবারো বিশাল লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজার ও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমদানিকৃত সারের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। সেই ঝুঁকিমুক্ত থাকতে দেশীয় সার কারখানাগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জন করাই দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার একমাত্র টেকসই সমাধান।

এদিকে ১.১ হাজার টন দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতার এই কারখানাটিকে আধুনিকায়ন, ভূমির সার্বিক সুরক্ষা এবং এর পূর্বনাম ‘আশুগঞ্জ জিয়া ফার্টিলাইজার’ পুনর্বহালের দাবিতে গত সোমবার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় এক সংক্ষিপ্ত বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এএফসিএল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে কারখানার শ্রমিকদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। সমাবেশ থেকে জমি লিজ দেয়ার যেকোনো পরিকল্পনা বন্ধ করে অবিলম্বে কারখানা আধুনিকায়ন অথবা একই স্থানে নতুন আধুনিক ইউরিয়া প্ল্যান্ট স্থাপনের দাবি জানানো হয়।

কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া গেলেই আবার উৎপাদনে ফেরা সম্ভব। কম গ্যাসে অধিক উৎপাদনের জন্য বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপারে আলোচনা চলছে। নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনাও প্রক্রিয়াধীন। অন্য দিকে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির উপমহাব্যবস্থাপক (সঞ্চালন) মোহাম্মদ বাপ্পি শাহরিয়ার জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মিললেই তারা কারখানাটিতে আবার গ্যাস সরবরাহ দিতে প্রস্তুত রয়েছেন।