গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ

১ পুলিশসহ আহত অর্ধশত সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ

Printed Edition

গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি

গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের মুখে একটি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন কর্তৃপক্ষ। গতকাল শনিবার মহানগরের কোনাবাড়ির যমুনা ডেনিমস লিমিটেড কারখানায় আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশের এক সদস্যসহ অর্ধশতাধিক শ্রমিক আহত হয় বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছে। পরে কর্তৃপক্ষ কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ইন্সপেক্টর (মিডিয়া সেল) মুহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, শ্রমিকরা আগে থেকেই বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল। কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি আগের কয়েকটি দাবি মেনে নেয়। পরে শ্রমিকরা শনিবার নতুন আরো কিছু দাবি নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থিত হয়। নতুন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত কারখানার সামনে বিক্ষোভে অংশ নেয়। কর্তৃপক্ষ সকাল ৯টার দিকে শ্রমিকদের কারখানার ভেতর ডেকে নেন এবং কাজে যোগ দিতে অনুরোধ করেন। শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড় থাকলে কর্তৃপক্ষ ছুটি দিয়ে তাদের গেটের বাইরে বের করে দেন। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে শ্রমিকদের একটি অংশ কারখানার সামনে সড়ক অবরোধ করে রাস্তায় অবস্থান নেন। এ সময় শ্রমিকদের সেখান থেকে সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়।

পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এতে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পাশর্^বর্তী কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের সামনে ও আশপাশের বিভিন্ন ফিডার রোডে ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের কনস্টেবল মোহাম্মদ আরিফ হোসেন ইটের আঘাতে আহত হন বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়।

শ্রমিকদের ৮ দফা দাবি হলো, পরিচালক (ডিরেক্টর) কাজল কান্তির পদত্যাগ, বকেয়া অর্জিত ছুটির (বার্ষিক) টাকা ২৫ জানুয়ারির মধ্যে পরিশোধ এবং পরবর্তী অর্জিত ছুটির (বার্ষিক) ছুটির টাকা ডিসেম্বর মাসে পরিশোধ করতে হবে, টিফিন বিল ৫০ টাকা এবং রাত ১০টার পর ডিউটি করানো হলে নাইট বিলের ১৫০ টাকা দিতে হবে, হাজিরা বোনাস হেলপার থেকে অপারেটর সবাইকে এক হাজার টাকা করে দিতে হবে, ৩ তারিখ থেকে ৪ তারিখের মধ্যে বেতনের পে-স্লিপ দিতে হবে, প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধ করতে হবে এবং যদি ৭ তারিখ শুক্রবার হয় তাহলে ৬ তারিখে পরিশাধ করতে হবে, জরুরি প্রয়োজনে ছুটি মঞ্জুর করতে হবে, ফ্লোরে কোনো স্টাফ শ্রমিকের সাথে খারাপ আচরণ এবং বাজে ভাষায় গালিগালাজ করতে পারবে না, কোনো শ্রমিক স্টাফের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিলে সরাসরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, এই আন্দোলনের জন্য কোনো শ্রমিক ও স্টাফের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যাবে না এবং চাকরি থেকে বহিষ্কার করা যাবে না।

শ্রমিকেরা জানায়, কর্তৃপক্ষ ৮ দফা না মেনে পুলিশ দিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত অর্ধশতাধিক শ্রমিক আহত হয়। আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এ দিকে কারখানার মহাব্যবস্থাপক স্বাক্ষরিত নোটিশে উল্লেখ করা হয়, বৃহস্পতিবার সকালে কিছু সংখ্যক উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক হঠাৎ করে কিছু অযৌক্তিক দাবি উত্থাপন করে সঙ্ঘবদ্ধভাবে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। একপর্যায়ে তারা কারখানার প্রধান ফটকে ইটপাটকেল ছুড়ে সম্পদের ক্ষতিসহ বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদেরকে কাজে যোগ দেয়ার অনুরোধ করে। শনিবার সকালে শ্রমিকেরা সকাল ৮ টার দিকে কারখানার প্রধান ফটকে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে বেআইনিভাবে বিভিন্ন উত্তেজনামূলক স্লোগান দিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখে। কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদেরকে অবৈধ ধর্মঘট পরিহার করে উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার অনুরোধ করেন। শ্রমিকেরা কর্তৃপক্ষের অনুরোধ না মানায় বেআইনি ধর্মঘটের প্রেক্ষিতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ শ্রম-আইন ২০০৬ এর ১৩(১) ধারায় মোতাবেক শনিবার (২৪ জানুয়ারি) থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য যমুনা ডেনিমস্ লিঃ বন্ধ ঘোষণা করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরবর্তীতে কারখানা খোলার তারিখ নোটিশের মাধ্যমে সকলকে অবহিত করা হবে।

এসব বিষয়ে যমুনা ডেনিমস লিমিটেড কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২ (কোনাবাড়ী জোন) পরিদর্শক মোর্শেদ জামান বলেন, উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।