গাজায় নতুন ইসরাইলি হামলার আশঙ্কা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ‘শান্তি পরিষদে’ নেতানিয়াহুর যোগ দেয়া যুগের প্রহসন : হামাস
  • ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভের মুখে গাজায় ফেরার পরিকল্পনা মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের
  • ইসরাইলি যুদ্ধে গাজায় প্রায় ৯০ শতাংশ স্কুল ধ্বংস : জাতিসঙ্ঘ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চার মাস ধরে চলমান যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন করার পর ইসরাইল আবারো গাজায় বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা করছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ইসরাইলি সেনারা হামাসকে জোর করে নিরস্ত্র করার উদ্দেশ্যে নতুন অভিযান চালাতে পারে। দক্ষিণ কমান্ড ইতোমধ্যে সম্ভাব্য কয়েকটি অভিযানের পরিকল্পনা করেছে। এবার হামলা আগের চেয়ে আরো তীব্র ও বিস্তৃত হতে পারে, কারণ গাজায় আর কোনো ইসরাইলি বন্দী নেই।

লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ঘনবসতিপূর্ণ দেইর আল-বালাহ ও আল-মাওয়াসি এলাকা, যেখানে আগের দুই বছরের যুদ্ধে স্থল সেনারা প্রবেশ করেনি। এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রস্তাবে হামাসকে প্রাথমিকভাবে কিছু হালকা অস্ত্র রাখার অনুমতি দেয়া হতে পারে, তবে ইসরাইলের নাগালে পৌঁছাতে সক্ষম অস্ত্র জমা দিতে হবে। হামাস বলছে, ইসরাইল পুরোপুরি প্রত্যাহার না করলে তারা নিরস্ত্র হবে না। আলোচনার দ্বিতীয় ধাপ স্থগিত হয়ে পড়ায় নতুন হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশ্লেষক গোকহান বাতু মনে করেন, ইসরাইলের হামলার প্রস্তুতির খবর আসলে হামাসের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল। তিনি সতর্ক করেছেন, নতুন হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করবে।

লন্ডনভিত্তিক বিশ্লেষক ইউসুফ আলহেলু বলেন, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ শক্তি দুর্বল হলেও প্রতিরোধের ধারণা কখনো শেষ হবে না। তিনি বলেন, ইসরাইল নিরস্ত্রকরণের অজুহাতে আরো হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসলীলা চালাতে চাইছে। অক্টোবর ২০২৫ থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি হামলায় ৫৭৪ ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ৫১৮ জন আহত হয়েছেন। বাতু ও আলহেলু দু’জনই মনে করেন, ইসরাইলি রাজনীতির চাপই নতুন হামলার হুমকিকে বাড়াচ্ছে। নেতানিয়াহু নির্বাচনের আগে হামাসকে নিরস্ত্র না করলে জনসমর্থন হারানোর আশঙ্কায় আছেন। তার ডানপন্থী মন্ত্রীরা শান্তি আলোচনার সব প্রচেষ্টা ভেস্তে দিতে চাইছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, নতুন হামলা হলে ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস কাঠামো, জাতিসঙ্ঘের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের পথ আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গাজায় ইতোমধ্যেই প্রায় প্রতিটি পরিবার লাশের শোক বহন করছে, যা ইসরাইলবিরোধী জনমতকে আরো শক্ত করছে।

‘শান্তি পরিষদে’ নেতানিয়াহুর যোগ দেয়া যুগের প্রহসন : হামাস

হামাসের নেতা ওসামা হামদান বলেছেন, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে অভিযুক্ত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তথাকথিত ‘শান্তি পরিষদে’ যোগ দেয়া যুগের প্রহসন। আল জাজিরায় সম্প্রচারিত বক্তব্যে তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে প্রতিরোধের অস্ত্র নিয়ে কোনো খসড়া বা আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব হামাস পায়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, হামাস অস্ত্র স্থগিত করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। যতদিন দখল থাকবে, প্রতিরোধকে বৈধ অধিকার হিসেবে দেখা হবে। হামদান বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণ কোনো ধরনের বাইরের অভিভাবকত্ব প্রত্যাখ্যান করে। গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী ইসরাইলি সেনাদের জায়গা নিতে পারে না। তিনি জানান, আন্দোলনটি ইন্দোনেশিয়া সরকারের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং স্পষ্ট করেছে যে আন্তর্জাতিক বাহিনীর ভূমিকা সীমিত থাকবে গাজার সীমান্তে মোতায়েন হওয়া পর্যন্ত, যাতে দখলদার বাহিনী থেকে আলাদা রাখা যায়। তিনি আরো বলেন, যদি কোনো আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠিত হয়, তবে তাদের কাজ হবে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর হামলা প্রতিরোধ করা। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভের মুখে গাজায় ফেরার পরিকল্পনা মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের

মার্কিন নিরাপত্তা কোম্পানি ইউজি সলিউশনস, জানিয়েছে তারা গাজায় নতুন ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বোর্ড অব পিসের সাথে আলোচনা করছে। কোম্পানিটি আগে গাজায় সাহায্য বিতরণ কেন্দ্র পাহারা দিতে সশস্ত্র সাবেক সেনাদের মোতায়েন করেছিল, যা নিয়ে জাতিসঙ্ঘের সমালোচনা হয়েছিল। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, কোম্পানিটি আরবি ভাষাভাষী যুদ্ধ-অভিজ্ঞ ঠিকাদার নিয়োগ করছে। বোর্ড অব পিসের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছে। খবর আল আরাবিয়ার।

নর্থ ক্যারোলিনাভিত্তিক ইউজি সলিউশনস গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তা দিয়েছিল। অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। জাতিসঙ্ঘ অভিযোগ করেছে, তাদের বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ফিলিস্তিনিরা নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি সেনারা গুলি চালায়, যাতে শত শত মানুষ মারা যায়। ইসরাইলি সেনারা দাবি করে, তারা হুমকি মোকাবেলা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে গুলি চালিয়েছে।

কোম্পানির মুখপাত্র বুধবার বলেন, তারা বোর্ড অব পিসের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে এবং ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। তবে নিরাপত্তা অগ্রাধিকার স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তারা বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিকল্পনা করছে। ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের প্রধান আমজাদ আল-শাওয়া বলেন, ‘জিএইচএফ এবং যারা এর পেছনে আছে তাদের হাতে ফিলিস্তিনিদের রক্ত লেগে আছে। তারা গাজায় স্বাগত নয়।’ জাতিসঙ্ঘ বলেছে, জিএইচএফের কার্যক্রম মানবিক নীতির পরিপন্থী ছিল। ইসরাইলি সেনারা স্বীকার করেছে, কিছু ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন, তবে সংখ্যা জানায়নি। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় গাজায় মানবিক সহায়তা বাড়ানো, হামাস অস্ত্র ত্যাগের পর ইসরাইলের প্রত্যাহার এবং বোর্ড অব পিসের তত্ত্বাবধানে পুনর্গঠন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ইউজি সলিউশনস জানিয়েছে, তারা মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনে নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত। তাদের ওয়েবসাইটে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং সাংস্কৃতিক সহায়তা কর্মকর্তা। কোম্পানিটি বলেছে, এসব পদ গাজায় সম্ভাব্য চুক্তির জন্য প্রস্তুতি এবং সিরিয়ায় তেল ও গ্যাস খাতে সম্প্রসারণের অংশ।

ইসরাইলি হামলায় গাজায় প্রায় ৯০ শতাংশ স্কুল ধ্বংস

জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, ইসরাইলের দুই বছরের আগ্রাসনের ফলে গাজা উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, যে স্কুলগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে শিশুদের অস্থায়ী স্থানে বা ডিজিটাল মাধ্যমে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। খবর আনাদোলুর।

ইউএনআরডব্লিউএ বলেছে, ‘গাজাজুড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ স্কুল ভবন ইসরাইলি আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।’ সংস্থার দলগুলো ধ্বংসকাণ্ডের মধ্যেও শিক্ষা সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৫৯১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং এক হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। ইসরাইলের গাজায় যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর এবং দুই বছর স্থায়ী হয়। এতে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন যাদের বেশিরভাগ নারী ও শিশু। যুদ্ধ গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে।