ফাইনালের কঠিন হিসাবে বাংলাদেশ

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের লড়াইয়ে বাস্তবসম্মতভাবে টিকে আছে পাঁচ দল। তালিকাটি দেখলে বাংলাদেশের অবস্থানটাই সবচেয়ে চমকপ্রদ। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড- তিন সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সাথে রয়েছে প্রথম দুই চক্রের ফাইনালিস্ট ভারত। আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ, যারা কখনো টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠতে পারেনি।

২০২৭ সালের ফাইনালের লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় স্থানে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকা, তৃতীয় নিউজিল্যান্ড। এই তিন দলের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ৫ নম্বরে থাকা ভারতও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ফলে চক্রের শেষ ছয় মাসের লড়াইয়ে হিসাবটা বেশ খোলা।

ফাইনালের জন্য ঠিক কত শতাংশ পয়েন্ট প্রয়োজন হবে, সেটিও নিশ্চিত নয়। তবে আগের চক্রগুলোর হিসাবে, ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের কাছাকাছি পয়েন্ট পেলেই এবার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার মতো অবস্থান তৈরি হতে পারে। এখনো বাকি ৩৩ টেস্ট। বর্তমান চিত্র কয়েক মাসের মধ্যেই পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।

এই সমীকরণেই বাংলাদেশের গল্পটা আলাদা। ৫৫.৫৬ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ স্থানে থাকা শান্তদের সামনে বাকি ছয়টি টেস্ট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দু’টি এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দু’টি টেস্ট খেলবে দেশের মাটিতে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার মাঠে খেলতে হবে আরো দু’টি টেস্ট।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে নিজেদের মাঠ। চলতি চক্রে ঘরের মাটিতে এখনো অপরাজিত শান্তরা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক জয় এবং টানা তিন টেস্ট জয়ের পর সেই আত্মবিশ্বাসও এখন দলের সাথে। তাই সামনে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজটি বাংলাদেশের ফাইনাল-সমীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হতে পারে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দুই টেস্টেই হারাতে পারলে বাংলাদেশের পয়েন্ট শতাংশ আবার ৬৫-এর ওপরে উঠে যাবে। কিন্তু এরপর সেই অবস্থান ধরে রাখাই হবে আসল পরীক্ষা। ৬৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে হলে বাকি ছয় টেস্টের পাঁচটিতেই জিততে হবে বাংলাদেশকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও প্রায় নিখুঁত থাকতে হবে। আরেকটি সম্ভাব্য সমীকরণও আছে। বাকি ছয় ম্যাচে চার জয় ও একটি ড্র পেলেও বাংলাদেশের পয়েন্ট শতাংশ ৬৪-এর সামান্য নিচে থাকবে। ফাইনালের লড়াইয়ে টিকে থাকতে শুধু ভালো খেলাই যথেষ্ট নয়, হিসাবটাও বাংলাদেশের পক্ষে থাকতে হবে।

তবে বাংলাদেশের কঠিন সমীকরণের বিপরীতে অন্য দলগুলোর পথও যে সহজ, তা নয়। শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়ার এখন ৯৬ পয়েন্ট। ৬৫ শতাংশের ওপরে থাকতে হলে বাকি ১২ টেস্টে অন্তত ছয়টি জয় ও একটি ড্র দরকার। আর সামনে তাদের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর, ভারত সফর এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠের সিরিজ। শীর্ষে থাকা অসিদেরও কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

৭৫ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকার পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বস্তির। তবে তাদের সামনেও রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিনটি হোম টেস্ট, বাংলাদেশের বিপক্ষে দু’টি এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটি। শ্রীলঙ্কার মাঠে খেলতে হবে আরো দু’টি টেস্ট। ৬৫ শতাংশের আশপাশে থাকতে শেষ ১০ টেস্টে ছয় জয় ও একটি ড্র প্রয়োজন হবে তাদের।

নিউজিল্যান্ডের পয়েন্ট শতাংশ ৫২। ঘরের মাঠে ভারত ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ থাকলেও অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে চার টেস্ট খেলতে হবে তাদের। পাকিস্তানের মাটিতেও রয়েছে দু’টি অ্যাওয়ে টেস্ট। ফলে কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকার সুযোগ থাকলেও সূচির কঠিন অংশটিও তাদের সামনে।

ভারতের অবস্থান আরো নাজুক। প্রথম দুই চক্রের ফাইনালিস্ট এবং প্রথম চক্রের রানার্সআপ দলটি এখন ৫১.৫২ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম স্থানে। তাদের সামনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচটি হোম টেস্ট এবং নিউজিল্যান্ডের মাঠে দু’টি অ্যাওয়ে টেস্ট। ৬০ শতাংশের ওপরে থাকতে হলে অন্তত পাঁচ জয় ও একটি ড্র প্রয়োজন ভারতের।

বাংলাদেশের পথ কঠিন হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। নিজেদের মাঠে চারটি টেস্ট। সেখানে ভালো ফল করতে পারলে সমীকরণ অনেকটাই নিজেদের হাতে রাখা সম্ভব। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাদের দু’টি অ্যাওয়ে টেস্টই হতে পারে ফাইনালের স্বপ্নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আরেকটি বিষয় ফাইনালের দৌড়ে থাকা পাঁচ দলের প্রত্যেকেরই সামনে কঠিন প্রতিপক্ষ। ফলে একটি দলের ব্যর্থতা অন্য দলের জন্য দরজা খুলে দিতে পারে। অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত-অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মতো সিরিজগুলোর ফল বাংলাদেশের সমীকরণেও প্রভাব ফেলবে।

তিন সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও দুই সাবেক ফাইনালিস্টের ভিড়ে বাংলাদেশের অবস্থান তাই এক দিকে বিস্ময়, অন্য দিকে সম্ভাবনার গল্প। এখন সমীকরণটা খুব সরল- ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জয় দিয়ে শুরু করতে হবে, এরপর ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ধারাবাহিকতা রাখতে পারলে নতুন যুগান্তকারী এক অধ্যায়ের সামনে দাঁড়াতে পারবে শান্ত বাহিনী।