সুনামগঞ্জে ভোটের লড়াই তুঙ্গে
২টিতে বিদ্রোহীদের চাপে বিএনপি ষ ৩টিতে দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস
Printed Edition
এম জে এইচ জামিল সিলেট
ভোটের বাকি আর মাত্র চার দিন। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় সরগরম হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গণসংযোগ, পথসভা, উঠান বৈঠক ও নির্বাচনী সভায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকরা। বিএনপি, জামায়াত ও তাদের জোট-সম্পৃক্ত দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আভাস মিলছে। জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে দু’টিতে বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থীর চাপে দলীয় প্রার্থী বেকায়দায়, আর তিনটিতে বিএনপি-জামায়াত সরাসরি দ্বিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপির বিদ্রোহীরা বহিষ্কৃত হলেও তাদের পক্ষে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ সক্রিয়। ফলে দলীয় প্রার্থীরা এক দিকে জামায়াত প্রার্থীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, অন্য দিকে দলীয় বিভক্তি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এতে সুনামগঞ্জের অন্তত দু’টি আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাকি তিনটি আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতার হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।
নির্বাচনের এবার আওয়ামী লীগের তৃণমূল সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে, তা বড় নিয়ামক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কারা বেশি গ্রহণযোগ- সে বিবেচনায় ভোট ভাগ হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে প্রচারণার শেষ সময়ে আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোটারদের টানতে নানা কৌশল নিচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে মোট ভোটার ২০ লাখ ৮০ হাজার ৩৩৫ জন। হাওর ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থার কারণে ৩২৩টি ভোটকেন্দ্রকে দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভোটগ্রহণে দায়িত্ব পালন করবেন ১৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রশাসন বলছে, দুর্গম কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজর রাখা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ-তাহিরপুর-ধর্মপাশা-মধ্যনগর) আসনে বিএনপির কামরুজ্জামান কামরুল ও জামায়াতের মাওলানা তোফায়েল আহমদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে। নেজামে ইসলামের প্রার্থী মাঠে থাকলেও ভোটের হিসাব মূলত দুই প্রার্থীকে ঘিরেই। বিএনপিতে প্রার্থী পরিবর্তনের পর প্রথমদিকে কিছু বিভ্রান্তি থাকলেও দলীয় নেতাকর্মীরা এখন ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচারণায় নেমেছেন বলে দাবি করছে দলটি।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে জামায়াতের হেভিওয়েট প্রার্থী আইনজীবী শিশির মনির এবং বিএনপির সাবেক এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরীর মধ্যে জোর প্রতিযোগিতা হবে। দিরাই উপজেলায় মুসলিম ভোটার বেশি, শাল্লায় হিন্দু ভোটারের পরিমাণ বেশ উল্লেখযোগ্য- এ কারণে ভোটের সমীকরণে এ আসনটিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। দুই প্রার্থীই সংখ্যালঘু ও সাধারণ ভোটারদেরকে কাছে টানতে আলাদা পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনে সাতজন প্রার্থী থাকলেও শেষ মুহূর্তে বিএনপির কয়ছর এম আহমদ ও বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী আনোয়ার হোসেনের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো থেকে একাধিক প্রার্থী থাকায় জোটের ভোট বিভক্ত হচ্ছে। জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের একক প্রার্থী না থাকায় জোটের তিনটি শরিক দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনজন। এতে পাল্লা ভারী হচ্ছে বিএনপির বিদ্রোহী (বহিষ্কৃত) প্রার্থীর। তবে শেষ সময়ে জোট একক প্রার্থী দিলে সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
সুনামগঞ্জ-৪ (সদর-বিশ্বম্ভরপুর) আসনে বিএনপির অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুলের সাথে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান জয়নুল জাকেরীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দলীয় ভোটে প্রভাব ফেলবে। এ সুযোগে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শামছ উদ্দিন শক্ত অবস্থানে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী থাকলেও লড়াই মূলত ত্রিমুখী রূপ নিয়েছে।
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন ও জামায়াতের শায়খ আব্দুস সালাম আল মাদানীর মধ্যে হবে মূল লড়াই। বিএনপির আরেক জনপ্রিয় নেতা মনোনয়ন প্রত্যাহার করে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামলেও তার ব্যক্তিগত সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে তা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। অন্য দলগুলোর প্রার্থী থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত দ্বিমুখী।
জামায়াত নেতারা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিবিরোধী অবস্থানকে প্রচারণার মূল বার্তা হিসেবে তুলে ধরছেন। বিএনপি নেতাদের দাবি, শেষ পর্যন্ত পাঁচটি আসনেই তাদের প্রার্থী জয়ী হবেন। তবে স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থী, ভোট বিভাজন, দুর্গম কেন্দ্রের উপস্থিতি এবং নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সুনামগঞ্জে নির্বাচনে বিজয় নির্ধারণ হবে।