আবার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে চাই

মীর মোকাম্মেল আহছান
Printed Edition
khela-5
ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করার পর লাল-সবুজ পতাকা জড়িয়ে পদক হাতে সাঁতারু নাজমুল হক হিমেল : সৌজন্য

১৯৫৮-৬১ সালের মধ্যে মোট ছয়বার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সাঁতারু ব্রাজেন দাস। তিনিই প্রথম এশিয়ান সাঁতারু হিসেবে চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন। এরপর ১৯৬৫ সালে এই চ্যানেল অতিক্রম করেছেন আবদুল মালেক। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৮ সালে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন মোশাররফ হোসেন। এরপর পেরিয়ে যায় দীর্ঘ ৩৭ বছর। এবার নতুন করে বাংলাদেশকে গৌরবের আসনে বসিয়েছেন কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছেলে নাজমুল হক হিমেল। তার সাথে ছিলেন সাবেক জাতীয় সাঁতারু মাহফিজার রহমান সাগর। গত ২৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টায় ইংলিশ চ্যানেলে নামেন নাজমুলরা। রিলেতে চ্যানেল পাড়ি দিতে সময় নেন ১২ ঘণ্টা ১০ মিনিট। তাদের এই অর্জনে আজ গর্বিত পুরো দেশ।

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার আবুল হাসেমের ছেলে নাজমুল হক হিমেল। জাতীয় সুইমিং ফেডারেশনের সাবেক সদস্য ও নিকলী সুইমিং ক্লাবের কোচ তিনি। হিমেলের জন্ম মীরহাটি গ্রামে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সে। সাঁতারে হিমেলের হাতেখড়ি বাবার হাত ধরে। যদিও নিকলীতে কোনো সুইমিংপুল নেই। হাওরের খোলা পানিতেই সাঁতার শুরুর পর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রথমবার তিনি কোচ হিসেবে পেয়েছেন মো: সোলায়মানকে। এরপর জাপানি কোচ ও সবশেষ চীনা কোচের অধীনে ছিলেন হিমেল। ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সাঁতারের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিয়ে ২৬টি স্বর্ণ ও ২১টি রৌপ্যপদক পেয়েছেন। বয়সভিত্তিক সাঁতারে আছে ছয়টি জাতীয় রেকর্ডও।

ছোটবেলা যখন সব সাঁতারুরা এক সাথে বসতেন, তখন বিভিন্ন সাঁতারুদের নিয়ে আলোচনায় চলত বলে জানান হিমেল। যেমন মাইকেল ফেলপসের মতো বিশ্বসেরা সাঁতারুদের। আলোচনার কমন বিষয় ছিল ইংলিশ চ্যানেল, ব্রজেন দাসও। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার ইচ্ছাটা তখনই জেগেছিল নিকলীর হাওর থেকে উঠে আসা এই সাঁতারুর।

এ সম্পর্কে হিমেল বলেন, ‘যখন আমরা একটা সীমানা অতিক্রম করেছি, আর্থিকভাবে সচ্ছলতা এসেছে, তখন মাহফিজার রহমান সাগর এক দিন বলেছিল, আমরা যারা সাবলম্বী, চলেন একটু চেষ্টা করি, ইংলিশ চ্যানেলে স্লট নিতে পারি কি না। তখন ছিল ২০২২ সাল। এক ধরনের কিউরিসি থেকেই স্বপ্নের চ্যানেলের কথা মাথায় আসে। যেহেতু সাঁতারুদের জন্য এটা এভারেস্ট জয়ের মতোই। তাই এর পরই সিরিয়াস হয়ে গেলাম এই চ্যালেঞ্জটা নিতে।’

তিনি যোগ করেন, ‘স্লট পাওয়ার জন্য আবেদন করি। স্লটটা পাওয়াই ছিল দুষ্কর। আমাদের এটা পেতে আড়াই বছর লেগেছে। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে যখন স্লট পায়, তখনই আমাদের মধ্যে একটা সিরিয়াসনেস চলে আসে। যেভাবেই হোক ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে হবে।’

স্বপ্নের ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে প্রায় এক মাস আগেই লন্ডনের উদ্দেশে পাড়ি জমান হিমেল-সাগররা। পানিতে নামার আগে যে একটা কনফিডেন্স প্রয়োজন, সেটাও এই সময়ের মধ্যে পেয়ে যায় তারা। এ সম্পর্কে হিমেলের ভাষ্য, ‘সেখানে অবস্থানকালে আমাদের যে একটা কনফিডেন্স প্রয়োজন ছিল, সেটা আমরা তখনই পেয়ে গেছি। চ্যানেলে নামার আগ মুহূর্তে অবশ্য এক ধরনের প্রেসার কাজ করেছে। প্রেসারটা আসলে তেমন নয় যে, আমরা পারব না- এটা ছিল এক ধরনের আকর্ষণ।’

‘স্থানীয় সময় রাত ২টা ৪৩ মিনিট শুরু করে (শুরু করেছিল সাগর) বোটের লাইট দেখে সুইমিং করতে হয়েছে। তখন ভয় থাকলেও একটা আলাদা আকর্ষণ কাজ করেছে। যদিও ভয়টা ওরকম কিছুই ছিল না। এভাবেই হিমেল বলেন, ‘জানি তো শার্ক থাকে না এখানে। তবে রাতের পানি খুবই ঠাণ্ডা ছিল। সাগরের পর আমি চ্যানেলে নামি। শেষের ১০ মিনিট ফিনিশিংটা করেছিল সাগর। মাঝে ছিল কলকাতার দুইজন।’

পানিতে জেলিফিস ছিল, তবে স্বচ্ছ পানি বলে আমরা সবই দেখতে পেয়েছি। আমাদের কারো সাথেই কোনো কিছু ঘটেনি। চোখের সামনে জেলি ফিস পড়লেও কখন যে আমার সময় শেষ হয়ে গেছে টেরই পাইনি। ঢেউ ও স্রোত আর আমাদের নিজস্ব যে স্পিড, তাতেই আমরা সহজেই পাড়ি দিতে পেরেছিলাম বলে জানান হিমেল।

চ্যানেল অতিক্রমের পর নিজেদের অনুভূতি নিয়ে হিমেল বলেন, ‘চ্যানেল অতিক্রমের শেষ সময় আমাদের যে ফিনিশার ছিলেন, সে স্রোতে পড়ে কিছুতেই সামনে এগোতে পারছিল না। ওই সময় আমাদের যে রেফারি ছিলেন, তিনি বলছিলেন পরে পানিতে নামতে সুইমার রেডি থাক। এরপর ফিনিশিংয়ের পর বোর্ড থেকে যে হুইসেল দেয়, যখন বলে ক্লিয়ার, মানে কমপ্লেট হয়েছে, তখন আমরা বলছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ...। ওই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি নিজেও তখন বুঝে উঠতে পারিনি আমরা কি করেছি। সবকিছুই তখন থেমে গিয়েছিল। নিজেরাই তখন অবাক হয়ে গেছি। আমরা চ্যানেল অতিক্রম করেছি। সাগর তো আমাদের চেয়ে প্রায় ২০০ মিটার দূরে ছিল। ও আসার পর সবাই মিলে সে কিভুল্লাস।’

চ্যানেলে পাড়ি দিতে জনপ্রতি ব্যয় হয়েছে প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার ডলার। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১০ লাখ। যার পুরোটাই নিজেরাই বহন করেছেন বলে জানান হিমেল। তবে সাঁতার ফেডারেশন চেষ্টা করছেন, সহযোগিতা করার জন্য। এখনো তেমন কোনো আশ্বাস পাননি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে হিমেল জানান, ‘আবার ইচ্ছা আছে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার। তবে এটা অনেক ব্যয়বহুল। যদি কোনো স্পন্সর পাওয়া যায় বা আর্থিক কোনো প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে, তাহলে চেষ্টা করব সিঙ্গেল স্লট পেতে।’

হাওর থেকে উঠে আসা সাঁতারুর ভাষ্য, বাংলাদেশের আগের তিন সাঁতারু একাই চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন। উনাদের মতো আমারও ইচ্ছা আছে একা চ্যানেল পাড়ি দেয়ার। কিন্তু সে ক্ষেত্রে স্লট পেতে অনেক সমস্যা হয়। এর আগে সাগরও চেষ্টা করেছিল; কিন্তু পায়নি। পরে পাশের দেশ ভারতের কলকাতার সাঁতারুরা স্লট পাওয়ায় আমরা সেখানে যুক্ত হয়েছিলাম।’

এই স্লটে এক সিঙ্গেলে প্রায় ৩৭ জনের মতো চ্যানেল পাড়ি দিয়েছে। আর ৭০ থেকে ৭৫টি টিমে রিলে হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রায় ৩০০ জনের মতো সাঁতারুর ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। সিঙ্গেল স্লট পেতে অনেক সময় লেগে যায়। তবে প্রথমে স্পন্সর ও পরে স্লট পেলে ইংলিশ চ্যানেল একাই পাড়ি দেয়ার ইচ্ছা আছে হিমেলের।