গাজাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত করছে ইসরাইল

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • গাজায় ইসরাইলি গুলিতে ফিলিস্তিনি শিশু নিহত
  • যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গুর অবস্থায়
  • গাজায় ইসরাইলি হামলা

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। সেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে নতুন রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এই বৈঠক ইসরাইলকে গাজা ও পুরো অঞ্চলে সামরিক অবস্থান বজায় রাখতে কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছে।

ডিসেম্বরের ২৯ থেকে জানুয়ারির ১ তারিখ পর্যন্ত হওয়া আলোচনায় শান্তি বা উত্তেজনা কমানোর কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় রাখা। এটি সবসময় পূর্ণমাত্রার গণহত্যা নয়, বরং গাজাকে স্থায়ী অস্থিরতায় আটকে রাখা। এতে ইসরাইল ১০ অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইচ্ছেমতো ভঙ্গ করতে পারে এবং বড় ধরনের লাশের ঘটনা এড়িয়ে রাজনৈতিক চাপ কমাতে পারে। এতে ইসরাইলের সরকারি বক্তব্যে বড় ধরনের বিরোধ দেখা যায়। নেতানিয়াহু ও তার জোট দাবি করেছে তারা ইতোমধ্যেই যুদ্ধ জিতেছে। তাহলে কেন গাজার বিষয়টি খোলা রাখা হচ্ছে। কারণ রাজনৈতিক, আদর্শিক ও কৌশলগত হিসাব। প্রথমত, নেতানিয়াহু মনে করছেন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মতামত একসময় গাজা এবং পরে পশ্চিমতীর থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদকে গ্রহণ করতে পারে। যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এই পরিকল্পনার অংশ।

এ কারণেই ইসরাইল খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী আটকে রাখছে। এগুলো গাজার প্রতিরোধ শক্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। বরং গাজাবাসীকে বেঁচে থাকা ও মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থায় আটকে রাখার কৌশল। চাপের মুখে ইসরাইল রাফাহ সীমান্ত খুললেও তা শুধু গাজার দিক থেকে বাইরে যাওয়ার জন্য। এটি ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের বের করে দেয়ার বড় পরিকল্পনার অংশ।

দ্বিতীয়ত, গাজায় যুদ্ধকে ব্যবহার করা হচ্ছে পশ্চিমতীরে দমননীতি বাড়ানোর জন্য। বসতি সম্প্রসারণ, দমন-পীড়ন ও দখল কার্যক্রম দ্রুততর হয়েছে। গাজায় গণহত্যার সময় পশ্চিমতীরের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে আড়ালে চলে যায়। কিন্তু শুরু থেকেই দুই জায়গার ঘটনা একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল। তৃতীয়ত, যুদ্ধ ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জরুরি অবস্থা বজায় রাখে। এতে নেতানিয়াহু ও কট্টরপন্থীরা রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারে এবং ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা নিয়ে জবাবদিহি এড়াতে পারে। প্রতিবার যখন অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ে, নেতানিয়াহু নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেন।

চতুর্থত, গাজার বিষয় শেষ হলে ইসরাইলকে রাজনৈতিক সমাধানের পথে যেতে হবে। এটি নেতানিয়াহু চান না। কারণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া মানে শান্তি আলোচনা, যা তার শাসন কৌশলের বিপরীত। পঞ্চমত, গাজাকে অসমাপ্ত কাজ হিসেবে দেখিয়ে ইসরাইল আঞ্চলিক উচ্চাকাক্সক্ষা বাড়াচ্ছে। লেবানন, সিরিয়া ও অন্যত্র সামরিক প্রভাব বিস্তারের অজুহাত হিসেবে গাজাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। নেতানিয়াহু নিজেই বলেছেন তিনি বৃহত্তর ইসরাইল গড়ার ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক মিশনে আছেন। শেষত, যুদ্ধ শেষ হলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা ও রাজনৈতিক সঙ্কট আবার সামনে আসবে। জরুরি অবস্থা তাকে এসব থেকে রক্ষা করছে। তার আইনজীবীরা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে আদালতের কার্যক্রম বিলম্বিত করছেন। সবমিলিয়ে গাজার যুদ্ধ শুধু সামরিক অভিযান নয়। এটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকা, আদর্শিক প্রকল্প ও আঞ্চলিক উচ্চাকাক্সক্ষার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজায় ইসরাইলি গুলিতে ফিলিস্তিনি শিশু নিহত : উত্তর গাজা উপত্যকায় গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে ১১ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি মেয়েশিশু নিহত হয়েছে। এটি গত বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের নতুন উদাহরণ বলে জানিয়েছে আনাদোলু। সূত্র জানায়, জাবালিয়া শরণার্থী ক্যাম্পে ওই শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়ে লাশে পরিণত হয়। এই এলাকা থেকে যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইলি সেনারা সরে গিয়েছিল বলে জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ক্যাম্পের পূর্বদিকে অবস্থান নেয়া ইসরাইলি সেনারা ভারী গুলি চালায়। এতে শিশুটি সরাসরি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ। ভয়াবহ এই হামলায় গাজা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি সেনারা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে ৪২৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন এক হাজার ১৮৯ জন।

গাজায় ইসরাইলি হামলা : ইসরাইলি সেনারা গাজা সিটির কাছে গতকাল বৃহস্পতিবার একটি রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সেনারা দাবি করেছে, ব্যর্থ রকেট উৎক্ষেপণের পরপরই এ হামলা চালানো হয়। ইসরাইল জানিয়েছে, রকেটটি তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেনি। তবে উৎক্ষেপণ কেন্দ্র শনাক্ত হওয়ার পরপরই সেটি ধ্বংস করা হয়েছে। খবর রয়টার্সের।

ইসরাইল অভিযোগ করেছে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় হামাস দুইবার যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেছে। হামাসের এক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা অভিযোগ যাচাই করছে। যুদ্ধবিরতির নাজুক পরিস্থিতি আরো স্পষ্ট হয় যখন স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ও উত্তর গাজায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে এক নারী ও এক শিশুর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে ইসরাইলি পক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি। ইসরাইল জানিয়েছে, বর্তমান যুদ্ধবিরতির ধাপ শেষ করতে হলে গাজায় বন্দী থাকা শেষ ইসরাইলি নাগরিকের লাশ ফেরত দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেছেন, লাশ ফেরত না আসা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপে যাওয়া হবে না। এ ছাড়া ইসরাইল এখনো গাজা ও মিসরের মধ্যে রাফাহ সীমান্ত খুলে দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি খোলার কথা থাকলেও ইসরাইল বলছে, লাশ ফেরত না আসা পর্যন্ত সীমান্ত খোলা হবে না।

যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গুর অবস্থায় : ইসরাইল ও হামাস একে অপরকে বড় ধরনের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। পরবর্তী ধাপের কঠিন শর্তগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় দূরত্ব রয়েছে। ইসরাইল গাজায় বিমান হামলা ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। সেনারা বলছে, গাজা থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার চেষ্টা তারা কঠোরভাবে দেখছে। হামাসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অক্টোবর থেকে তারা ইসরাইলের ১১০০টিরও বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এবং মধ্যস্থতাকারীদের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। এসব লঙ্ঘনের মধ্যে রয়েছে হত্যা, আহত করা, গোলাবর্ষণ, বিমান হামলা, বাড়িঘর ধ্বংস এবং মানুষকে আটক করা।

হামাস অস্ত্র ছাড়তে অস্বীকার করেছে এবং গাজার প্রায় অর্ধেক এলাকায় ইসরাইলি সেনারা অবস্থান করলেও তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে। ইসরাইল বলেছে, হামাস শান্তিপূর্ণভাবে নিরস্ত্র না হলে তারা আবার সামরিক অভিযান শুরু করবে। গাজা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। একই সময়ে তিনজন ইসরাইলি সেনাও নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা ইসরাইলে হামলা চালিয়ে প্রায় ১২০০ জনকে হত্যা করে এবং ২৫১ জনকে বন্দী করে নিয়ে যায়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এর পর থেকে ইসরাইলি অভিযানে ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।