পাবনায় লোডশেডিংয়ে বিদ্যুৎচালিত ৩৩ হাজার তাঁত বন্ধ

Printed Edition
bangla-1
লোডশেডিংয়ের কারণে বন্ধ হয়ে আছে তাঁত কারখানা : নয়া দিগন্ত

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)

ঘন ঘন লোডশেডিং, সুতা ও রঙের অতিরিক্ত দাম এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ত্রিমুখী চাপে পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে ভয়াবহ ধস নেমেছে। তীব্র লোকসানের মুখে জেলার প্রায় ৩৩ হাজার বিদ্যুৎচালিত তাঁত (পাওয়ারলুম) পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র তাঁতি, সাধারণ শ্রমিক ও জোগালীসহ প্রায় ৯০ হাজার মানুষ। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে আয়ের পথ হারিয়ে এসব পরিবার এখন মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।

বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ডের পাবনা সদর ও সাঁথিয়া বেসিক সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, পাবনা একটি অন্যতম বৃহৎ তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা। ২০০৩ সালের সরকারি জরিপ অনুযায়ী, এ জেলায় বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম ও চিত্তরঞ্জন তাঁতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার। বিশেষ করে পাবনা সদর, সাঁথিয়া, সুজানগর, বেড়া, ঈশ্বরদী ও ফরিদপুর উপজেলায় এই শিল্পের মূল বিস্তার। এ অঞ্চলের তৈরি শাড়ি ও লুঙ্গি দেশের বিপুল চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হতো। কিন্তু বর্তমানে তাঁতপল্লিগুলোতে চাহিদামতো বিদ্যুৎ না থাকায় অধিকাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যা-ও সামান্য উৎপাদিত হচ্ছে, বাজারে কাক্সিক্ষত দাম না থাকায় বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

পাবনার তাঁতপ্রধান গ্রামগুলোতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় একদম ভিন্ন চিত্র। যে পাড়াগুলোতে একসময় দিনরাত খটখট শব্দে মুখরিত থাকত, সেখানে এখন শ্মশানের নীরবতা। লোডশেডিংয়ের কারণে কাজ বন্ধ রেখে কারখানার সামনে মলিন মুখে বসে আছেন শ্রমিকরা। উৎপাদনে ধস নামায় অনেক মালিক কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।

সাধারণত প্রতিটি বিদ্যুৎচালিত তাঁতে সুতা তৈরি, রং করা, শুকানো, নলি ভরা ও কাপড় বোনার কাজে তাঁতপ্রতি গড়ে ৩ থেকে ৪ জন শ্রমিক প্রয়োজন হয়। এ খাতের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭ লাখ মানুষের রুজি-রোজি জড়িত। প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার শ্রমিক পরিবারের অন্তত ৬ লাখ সদস্য এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করেন। তবে কাজ হারিয়ে অনেক ক্ষুদ্র তাঁতি ও শ্রমিক বাধ্য হয়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাদের অনেকে তৈরী পোশাক কারখানায় যোগ দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ রিকশা-ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নিয়েছেন।

পাবনার কুলুনিয়া গ্রামের তাঁত মালিক সৈয়দ আলী জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হয়। প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে ১০ থেকে ১২ লিটার ডিজেল লাগে, যার পেছনে অতিরিক্ত দেড় হাজার টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে গেছে। একই গ্রামের সুতা ব্যবসায়ী কামাল ব্যাপারি বলেন, ৫০ কাউন্টের এক বেল সুতা এক বছর আগে ছিল ১৪ হাজার ৫০০ টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২০০ টাকায়। কাঁচামালের এমন দাম বাড়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জালারপুর গ্রামের তাঁত শ্রমিক আবুল হোসেন আফসোস করে বলেন, আগে দিনে ৩ থেকে ৪টি শাড়ি বোনা যেত, আর এখন বিদ্যুৎ না থাকায় দিনে ২টি তৈরি করাই কঠিন। সাঁথিয়ার শ্রমিক রহম আলী ও আব্দুল কদ্দুস জানান, আগে সপ্তাহে যেখানে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা আয় হতো, তা এখন নেমে এসেছে ১ থেকে দেড় হাজার টাকায়। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে দিনভর অলস বসে থাকতে হয়।

শাহজাদপুর হাটের পাইকারি বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম জানান, আগে রংপুর, ঢাকা বা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা প্রতি হাটে ৭-৮ ট্রাক কাপড় কিনে নিয়ে যেতেন। কিন্তু অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের কারণে কাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন ব্যবসায়ীরা মাত্র ১-২ ট্রাক কাপড় কিনছেন। পাবনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিয়নের সাবেক পরিচালক কেরামত উল্লাহ এবং হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান বলেন, তাঁতিদের একদিকে বিদ্যুতের ন্যূনতম বিল দিতে হচ্ছে, অন্য দিকে চড়া দামে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে লোকসানের পাল্লা ভারী হওয়ায় মালিকরা কারখানা চালাতে পারছেন না।

পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও আতাইকুলা হাটে সপ্তাহে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হতো। এমনকি ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে শাড়ি-লুঙ্গি কিনে নিয়ে যেতেন। তবে স্থানীয় ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, বর্তমানে কাপড় বিক্রি, রফতানি ও ব্যাংক লেনদেন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।