নাগরিক নিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া বিএনপির অগ্রাধিকার : তারেক
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হচ্ছে তার আগামীদিনের মূল অগ্রাধিকার।
গতকাল শনিবার দুপুরে ‘আমার ভাবনায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় রিল-মেকিং প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের সাথে আলাপচারিতায় বিএনপি চেয়ারম্যান তার এই পরিকল্পনা জানান। তিনি বলেন, আমাদের প্রথম বিষয় হচ্ছে ল’ অ্যান্ড অর্ডার নিশ্চিত করা। মানুষ নিরাপদে থাকতে চায়, সেটা ইনসিউর করতে হবে। আর করাপশন আমাদেরকে যেভাবেই হোক এড্রেস করতে হবে। এই দুটো বিষয়ে যদি আমরা একটু ভালো করে এড্রেস করতে পারি অন্য সমস্যাগুলো অনেকাংশে সমাধান হয়ে আসবে। এটি হচ্ছে আমার প্ল্যান।
গুলশানে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ পার্কের উন্মুক্ত স্থানে এই সাক্ষাতের আয়োজনটি করা হয়। জাতীয় রিল-মেকিংয়ের ১০ জন বিজয়ীদের সাথে কথা বলেন তারেক রহমান। সাথে ছিলেন তার মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। বিজয়ীরা তাদের নানা জিজ্ঞাসা তারেক রহমানকে করেন এবং খোলামেলা জবাবও দেন তিনি।
ফ্যামিলি কার্ড কারা পাবে, স্বামীহারা নারীরা কী ফ্যামিলি কার্ড পাবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক বলেন, সিঙ্গেল মাদার ব্রাইড যারা বিভিন্ন রকম সমস্যার মধ্যে আছেন, স্বামী ছেড়ে গেছেন এরা অগ্রাধিকার পাবেন। বাংলাদেশ সরকারের সোশ্যালসেফটির আওতায় ১৩৮টি প্রজেক্ট চালু হয়েছে, বিভিন্ন মিনিস্ট্রি বা ডিপার্টমেন্ট সেগুলো কোনোভাবে চালু রেখেছে। কিন্তু এগুলো ঠিক নেই। রিসোর্স নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সাপোর্ট সঠিকভাবে পাচ্ছে না। আমরা এই জিনিসটিকে একটু অর্গানাইজ করতে চাইছি। আমরা এটিকে ইউনিভার্সালির জন্য রেখেছি। যেমন একজন কৃষকের স্ত্রীও পাবেন, একজন ভ্যানচালকের স্ত্রী পাবেন, আরেকজন অফিসিয়াল তার ওয়াইফও পাবেন।
শিশুরা মোবাইলের ওপর আসক্ত হয়ে নেগেটিভ জিনিসগুলো দেখে সেক্ষেত্রে কী করা যায় একজন প্রশ্ন করলে তারেক রহমান বলেন, এখানে কাজ করার আছে। আব্বার (জিয়াউর রহমান) সময় নতুন কুঁড়ি নামে একটা অনুষ্ঠান ছিল। এটি অবশ্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আবার চালু করেছে। আমরা আমাদের পরিকল্পনায় আমাদের স্পোর্টস নিয়ে একটা পরিকল্পনা আছে। স্পোর্টসের পরিকল্পনা আমরা বলেছি, আমরা নতুন কুঁড়ির সাথে স্পোর্টসটা যুক্ত করতে চাইছি। একটা শিশু যখন ছয় বছর, সাত বছর, আট বছর, ১০ বছর, ১৫ বছর, ১৮ বছর আমরা সবাই এই স্টেজটা পার হয়ে এসেছি। এই স্টেজে কিন্তু মানুষের শারীরিক ও মানসিক অনেক এনার্জি থাকে। আপনাকে তো এনার্জিটাকে বার্ন করতে হবে। আপনাকে যদি সঠিক জায়গা দেয়া হয় তাহলে আপনি সঠিক জায়গায় বার্ন করবেন, আর আপনাকে যদি সঠিক জায়গা না পান তাহলে বেঠিক জায়গায় আপনি বার্ন করবেন এবং সে জন্যই আমরা নতুন করে নতুন কুঁড়ি, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস এই দুটো চালু করতে চাইছি। আমরা আমাদের এডুকেশন সিস্টেমটাকে যেটা যেভাবে সাজাতে চাইছি।
স্কুলপর্যায় সিলেবাসে ক্রীড়া, তৃতীয় ল্যাংগুয়েজ, আবৃত্তি, কলা, গান, শিল্প-সংস্কৃতি বিষয় যুক্ত করার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তারেক বলেন, আপনি যখন একটা বাচ্চাকে এই জায়গায় ব্যস্ত করেন তখন কিন্তু ওই যে ইন্টারনেট ঢুকে ব্রাউজ করে এটি কমে আসবে। কারণ পাস ফেলের ব্যাপার আছে। তিনি বলেন, পড়ালেখাটাকে আমরা ইজি করে আনতে চাচ্ছি। পড়ালেখাটাকে ইজি করতে চাই যাতে শিশুরা ইন্টারেস্ট পায়। আপনি যখন ইন্টারেস্ট তৈরি করতে পারবেন তখন স্বাভাবিকভাবে অন্য জায়গাতে কিন্তু মাইন্ড টাইট হবে। তখন এগুলোতে ইন্টারেস্ট পাবে। এভাবে আমরা জিনিসটিকে সাজাতে চাই।
ঢাকার যানজট নিরসন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, আমাদের ঢাকায় আপনার ধারণা আছে এখন কত মানুষ ঢাকায় থাকে আমি লাস্ট যেটা শুনেছিলাম তিন কোটি প্লাস মানুষ। এই ট্রাফিক জ্যাম হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ আছে- প্রথমত, আমাদের রোড ডিজাইনিং; দ্বিতীয়ত, আমাদের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজমেন্ট পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম আর থার্ড হচ্ছে বেশ কতগুলো ফ্যাসিলিটি। ফ্যাসিলিটির মধ্যে এডুকেশন আছে, হেলথ আছে, সিকিউরিটি আছে, জব সিকিউরিটি আছে। এসব কিছুই কম-বেশি আপনার ঢাকা কেন্দ্রে গড়ে উঠেছে। আমি কিছু দিন আগে এক ভদ্রলোকের সাথে আলাপ করেছিলাম, উনি একজন আর্কিটেক্ট। প্রথমে আমি আর্কিটেক্টের সাথে কী আলোচনা হয়েছিল সেটি বলি। একটা চিন্তা আমার ছিল এবং কিছু কিছু দেশে আমরা দেখেছি, আমরা কোরিয়াতে দেখেছি, চায়নাতে দেখেছি। সেটি হচ্ছে, আপনি যদি ঢাকা থেকে রেলগাড়িতে দ্রুত গন্তব্যে চলে যেতে পারেন। যদি এক ঘণ্টায় ময়মনসিংহে পৌঁছাতে পারবেন, এক ঘণ্টায় মুন্সীগঞ্জ পৌঁছাতে পারবেন, মানিকগঞ্জ পৌঁছাতে পারবেন, টাঙ্গাইল পৌঁছাতে পারবেন, তাহলে বিষয়টি সহজ হয়ে যায়। আমাদের চিন্তায় আছে যে, এখানে আমরা ছোট ছোট স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তুলব। ওখানে বেসিক সাপোর্টগুলো থাকবে। বেসিক সাপোর্টের মধ্যে স্কুল থাকবে ভালো, এডুকেশন থাকবে, চিকিৎসা সুবিধা থাকবে, গ্রোসারি মার্কেট থাকবে, সিকিউরিটি এনসিউর করার চেষ্টা করা হবে।
চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে আজ তারেক রহমানের নির্বাচনী মহাসমাবেশ
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন। গতকাল শনিবার রাত সাড়ে ৭টার কিছু পরে বিমানযোগে তিনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছান। চট্টগ্রাম পৌঁছেই নির্ধারিত বুলেটপ্রুফ বাসে চড়ে হোটেল রেডিসনের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের বেশি সময় পর তিনি চট্টগ্রামে আসলেন। আজ রোববার সকালে নগরীর ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তিনি। মহাসমাবেশকে ঘিরে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে উচ্ছ্বাসের কমতি নেই।
পলোগ্রাউন্ড মাঠে প্রস্তুত করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬০ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট এ মঞ্চ নির্মাণ কাজ তদারকি করেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা: শাহাদাত হোসেন।
দলীয় চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথমবারের মতো তারেক রহমানের চট্টগ্রাম আগমনকে ঘিরে পুরো চট্টগ্রামজুড়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। বিভিন্ন মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নেতাদের পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে পুরো বন্দরনগরী, বিশেষত কাজিরদেউরী ও টাইগারপাস এলাকা।
সিএমপিসূত্র জানিয়েছে, মহাসমাবেশকে ঘিরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। সমাবেশস্থলকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়াসহ সব প্রস্তুতিমূলক বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মিটিং সম্পন্ন হয়েছে। সমাবেশকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুই হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবে বলে সিএমপিসূত্র জানিয়েছে। ইতোমধ্যে পোশাকধারী সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
পলোগ্রাউন্ডের মহাসমাবেশের পাশাপাশি আজ সকাল সাড়ে ৯টায় চট্টগ্রামের হোটেল রেডিসনে তরুণদের সাথে ‘পলিসি ডায়ালগ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় যোগ দেবেন তারেক রহমান। এরপর বেলা ১১টায় পলোগ্রাউন্ড মাঠে নির্বাচনী মহাসমাবেশে বক্তব্য দেবেন তিনি।
চট্টগ্রামে ড্রোন উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা : এ দিকে পলোগ্রাউন্ড মাঠে মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রায় বিশেষ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। ২৩ জানুয়ারি রাতে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় কোনো ব্যক্তি অস্ত্রশস্ত্র, তলোয়ার, বর্শা, বন্দুক, ছোরা, লাঠি, বিস্ফোরক দ্রব্য, ইট-পাথর বহন ও ব্যবহার করতে পারবেন না। একই সাথে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী কোনো বস্তু প্রদর্শন, প্ল্যাকার্ড বহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া জনসমাবেশ এলাকায় ‘ড্রোন নিবন্ধন ও উড্ডয়ন নীতিমালা-২০২০’ এর ধারা ৯ ও ১৩ অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া ড্রোন উড্ডয়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ২৯ ধারা অনুযায়ী এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
বিএনপি নেতাদের মাঠ পরিদর্শন : এ দিকে পলোগ্রাউন্ড মাঠে আজ বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মহাসমাবেশকে সফল করতে সমস্ত কার্যক্রম সুসম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা: শাহাদাত হোসেন।
গতকাল শনিবার দুপুরে মহাসমাবেশকে সফল করতে গৃহীত প্রস্তুতি কার্যক্রম তদারকির অংশ হিসেবে পলোগ্রাউন্ড মাঠ সরেজমিনে পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা জানান।
পরিদর্শনকালে মেয়র বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে নানা ষড়যন্ত্র চললেও তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বরাবরের মতোই গণতন্ত্রের পক্ষে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে, রোববারের মহাসমাবেশ সে ধারাবাহিকতারই অংশ। তিনি আরো বলেন, শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশে মহাসমাবেশ আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। নগরবাসীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবেন, এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে মেয়র সবাইকে সমাবেশে উপস্থিত হয়ে গণতন্ত্রের পক্ষে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার আহ্বান জানান। মেয়র আরো বলেন, মহাসমাবেশকে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা জনদুর্ভোগ যেন সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও নাগরিক ভোগান্তি এড়ানো আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি হারুন অর রশীদ, ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ান, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া, মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমানসহ বিএনপি নেতাকর্মীরা।