জার্মানির দুঃস্বপ্নের রাত

জার্মানি-১(৩) প্যারাগুয়ে-১(৪)

Printed Edition
khela-2
ষষ্ঠ পেনাল্টি শটে ন্যুয়ারকে পরাস্ত করে প্যারাগুয়েকে শেষ ষোলোতে নিয়ে গেলেন জোসে কানালে : ইন্টারনেট

ক্রীড়া ডেস্ক

চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী জার্মানির বিশ্বকাপ যাত্রা থেমে গেছে শেষ ৩২-এ। বস্টনে অনুষ্ঠিত ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-১ সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। জার্মান সংবাদমাধ্যম বিল্ড এই ফলকে আখ্যা দিয়েছে ‘জার্মান ফুটবলের পরবর্তী দুঃস্বপ্ন’ নামে।

একসময় ফুটবল টুর্নামেন্ট মানেই জার্মানিকে শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার ধরা হতো। পশ্চিম জার্মানিসহ ইতিহাসে চারবার বিশ্বকাপ জয়, আরো চারবার ফাইনাল খেলা এবং ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ছয় ফাইনালের তিনটিতে শিরোপা, এই ঐতিহ্যই তাদের পরিচয় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই জার্মানিকে যেন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে জার্মানির পতনের ধারাবাহিকতা আরো স্পষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে দু’বার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে, আর এবার প্রথম নকআউট ম্যাচেই থামতে হলো তাদের। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ১০ নম্বরে থাকা দলটি হারল ৪১ নম্বরে থাকা প্যারাগুয়ের কাছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা, বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টাইব্রেকারে হার দেখল জার্মানি।

ম্যাচজুড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ বলের দখল ছিল জার্মানদের। তবে সংগঠিত ও ধৈর্যশীল প্যারাগুয়ের রক্ষণ ভাঙতে বারবার ব্যর্থ হয় তারা। ৪২ মিনিটে মাতিয়াস গালারসার ক্রস থেকে সাবেক ব্রাইটন ও ইপসউইচ ফরোয়ার্ড হুলিও এনসিসো হেডে গোল করে প্যারাগুয়েকে এগিয়ে দেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচে ফেরে জার্মানি। ৫৩ মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের ক্রস থেকে কাই হাভার্টজের গ্ল্যান্সিং হেডে সমতা ফেরে। পরে কর্নার থেকে জোনাথান তাহ গোল করলেও ভিএআর পর্যালোচনার পর সতীর্থের ফাউলের অভিযোগে সেটি বাতিল হয়।

অতিরিক্ত সময়েও আর গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। বিশ্বকাপে আগের চারটি টাইব্রেকারের সবগুলো জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়েই এগিয়েছিল জার্মানি। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

প্রথম শটেই ব্যর্থ হন হাভার্টজ। নিউক্যাসলের ফরোয়ার্ড নিক ভোল্টেমাডের শটও ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক গিল। প্যারাগুয়েও দু’টি সুযোগ নষ্ট করলেও শেষ দিকে জোনাথান তাহ শট বারের অনেক ওপর দিয়ে মারেন। এরপর ডিফেন্ডার হোসে কানালে সফল স্পট-কিকে প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন।

ম্যাচ শেষে হতাশ জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান বলেন, ‘বিশ্বকাপ থেকে প্যারাগুয়ের কাছে বিদায় নেয়া খুব তিক্ত অনুভূতি। এটা খুব কষ্টের। টানা তৃতীয়বার আমরা ব্যর্থ হলাম। এখন আর আমরা প্রথম সারির দল নই।’

২০২৩ সালে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেয়া নাগেলসমান এর আগে ২০২৪ ইউরোয় ঘরের মাঠে কেবল কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন। এবারের বিশ্বকাপে শুরুটা অবশ্য ভালোই ছিল- কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারানো এবং আইভরি কোস্টের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও ২-১ জয়। তবে গ্রুপের শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের কাছে ২-১ ব্যবধানে হারের পর নকআউটে এসে ধাক্কাটা আরো বড় হলো। জার্মানির সাবেক ডিফেন্ডার আর্নে ফ্রিডরিখ মনে করেন, পুরো টুর্নামেন্ট বিচার করলে এই হার প্রাপ্য। তার ভাষায়, ‘নাগেলসমানকে এর পরিণতি মেনে নিতে হবে।’

সাবেক মিডফিল্ডার টমাস হিটজলস্পারগারও কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘এত সমস্যার মধ্যে জার্মানি কিভাবে এই টুর্নামেন্টে এলো, সেটা বোঝা কঠিন। বিশ্বকাপের বিস্তৃত ফরম্যাটে এত দ্রুত বিদায় নেয়া বড় দলের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।’

তবে নাগেলসমান নিজে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেননি। তিনি বলেন, ‘আমি পালিয়ে যাওয়ার মানুষ নই। আজ জার্মানিতে জরিপ করলে হয়তো অনেকেই আমাকে রাখতে চাইবে না। কিন্তু জার্মান ফুটবল ফেডারেশন চাইলে আমি দায়িত্ব চালিয়ে যাব।’

ম্যাচের আগেই সমালোচনা শুরু হয়েছিল। সাবেক লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ, যিনি টিভি বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছিলেন, ইকুয়েডর ম্যাচের পর বলেছিলেন জার্মানি ভুল পদ্ধতিতে খেলছে এবং প্রতিপক্ষের আগ্রাসনের সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, জার্মান ফুটবলের বড় সঙ্কট এখন মানসিকতা ও চরিত্রে। হিটজলস্পারগারের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জার্মানি পাসিং, কৌশল ও সুন্দর ফুটবলের দিকে বেশি ঝুঁকেছে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে ভয় ধরিয়ে দেয়ার যে তীক্ষèতা ছিল, সেটি হারিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘এখন দলগুলো জার্মানিকে সম্মান করে কিন্তু ভয় পায় না। আমরা আর আগের মতো কঠিন প্রতিপক্ষ নই।’

এদিকে এই ঐতিহাসিক জয়ের পর প্যারাগুয়ে শেষ ষোলোতে উঠেছে। আগামী ৪ জুলাই ফিলাডেলফিয়ায় তাদের প্রতিপক্ষ হবে ফ্রান্স অথবা সুইডেন। আর জার্মানির সামনে আবারো শুরু হলো আত্মসমালোচনা, পুনর্গঠন এবং হয়তো নতুন কোচ খোঁজার অধ্যায়।