নাগরিক ভাবনা
Printed Edition
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রেষারেষি, কাদা ছোড়াছুড়ি, দলীয় চিন্তায় আচ্ছন্নতা- পতিত সরকারের উচ্ছিষ্টভোগীদের সুযোগ করে দিচ্ছে সরব হওয়ার, রাজনীতির মঞ্চে আবির্র্ভূত হওয়ার। সম্প্রতি আনসারদের সচিবালয় অবরোধ, চাকরিচ্যুত প্রশিক্ষণ সমাপ্তকারী পুলিশ অফিসারদের সচিবালয় অবরোধ করে উন্মাদনা তৈরি, হঠাৎ দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন, ডাকাতি, রাহাজানির উত্থানে পরিস্থিতি শঙ্কাজনক। ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠন, রিকশাচালক ও জনগণের যে লৌহকঠিন ঐক্য দেখা গিয়েছিল; তা আমাদের আশা জাগিয়ে ছিল, নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু এখন নিত্যদিন দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক কলহ আর দেশের বাইরের রক্তচক্ষু হায়েনার লোলুপ দৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ নাগরিকদের শঙ্কা ও অস্থিরতা নেতারা কতটুকু ভাবছেন? তাদের এই অনৈক্য সুযোগ করে দিচ্ছে পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসিত হওয়ার। যদি কোনোভাবে পরাজিত শক্তি পুনর্বাসিত হয় তাহলে আজকে বাদানুবাদে লিপ্ত নেতারা কি রক্ষা পাবেন?
পরিবারকেন্দ্রিক ফ্যাসিবাদ, বিচারিক প্রতিষ্ঠানের অকার্যকারিতা, মেধার চরম অবমূল্যায়ন, গুম, খুন দখলদার সর্বোপরি প্রতিবেশীর তাঁবেদারির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছিল এ দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা- যা রাজনৈতিক দলগুলো করতে ব্যর্থ হয়েছিল। অথচ ৬ আগস্টের ন্যারেটিভ পুরোপুরি বদলে দেয়ার প্রতিযোগিতা দেখে জনগণ এখন অবাক। জনগণ দেখেছেন, এই আন্দোলনে কতজন রাজনৈতিক নেতা জীবন দিয়েছেন, রাস্তায় পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন। খুব একটা সন্তোষজনক চিত্র পাওয়া যাবে না। সাধারণ ছাত্র-জনতার এত রক্তক্ষয়-জীবন দান, অসময়ে পঙ্গু হয়ে হাসপাতালের শয্যায় তাদের অসহায় আর্তনাদ- সব কিছুকে পেছনে ঠেলে চরদখলের মতো আন্দোলনের অর্জন দখলের প্রতিযোগিতা নিশ্চয়ই গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচায়ক নয়। সত্য কোনো মতেই চেপে রাখা যায় না। কোনো না কোনো সময় সত্য তার আপন গতিতে বেরিয়ে আসবেই। মাথা থেকে সিন্দাবাদের দৈত্যকে নামানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও নেতারা অত্যাচারিত হয়েছেন, জেল খেটেছেন- এ কথা যেমন অস্বীকার করার উপায় নেই, তেমনি এ কথাও সত্য, ত্যাগ-তিতিক্ষা, কোরবানি ও জুলুমের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে দেশের শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ এগিয়ে ছিলেন। যারা এই সত্য অস্বীকার করে নতুন ন্যারেটিভ রচনা করেছেন তাদের কাছে দেশ, দেশের মানুষ, দেশের সার্বভৌমত্বের মূল্যায়ন কতটুকু বিবেচ্য তা নিয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক বৈকি!
আগস্ট বিপ্লবের পর জাতি স্বভাবতই আশা করেছিল, স্বপ্ন দেখেছিল, স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলেছিল এই ভেবে যে, এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে জাতি একটি সুষ্ঠু-অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে এগোবে। সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দল এবং নেতাদের দোদুল্যমানতা আবারো ঈশানকোণে লাল মেঘের অশনিসঙ্কেত তৈরি করেছে। বেশি দিনের কথা নয়, রাজনৈতিক মতবিরোধের সূত্র ধরেই স্যার স্টিফেন নাহিয়ান এ দেশে এসেছিলেন দূতিয়ালি করতে। এ দেশের রাজনীতিতে বহিরাগত হস্তক্ষেপের সেই সূচনা। এরপর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে নেতাদের ধরনা দেয়ার প্রবণতা ও প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে সুজাতা সিং উড়ে এসে রীতিমতো রাজনৈতিক নেতাদেরকে ধমকিয়ে-ভয় দেখিয়ে পাতানো নির্বাচনমুখী করেছিলেন। এই ধারার অবসান এখনো হয়নি। এখনো বাইরের হিংস্র্র শ্বাপদরা ভূমিকা রাখতে চাইছে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে। এখন জাতির গভীর সঙ্কটকাল। এ সঙ্কট উত্তরণের একমাত্র উপায় জাতির ইস্পাতকঠিন ঐক্য। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মৌলিক সাংবিধানিক, বিচারবিভাগীয় ও প্রশাসনিক সংস্কার শেষে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন এখন প্রাধিকার। নির্বাচন শেষে নির্বাচিত সরকার বাকি বিষয়গুলো সংস্কারের ব্যবস্থা করবে।
শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর দায়বদ্ধতা নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি। যেন ভবিষ্যতে এরা কোনো দলের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীতে পরিণত না হয়- তার নিশ্চয়তা ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা প্রস্তাবিত সংস্কারে থাকা প্রয়োজন। না হলে আওয়ামী দলীয় ক্যাডাররা যেভাবে পুলিশ, আনসার এমনকি সেনাবাহিনীর সদস্যদের ঠেঙিয়েছে অবলীলায়, তেমনি পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে- যার আলামত এখনই দেখা যাচ্ছে। এগুলো কঠোর হাতে দমন করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
এই মুহূর্তে জনগণ ও সেনাবাহিনীর ঐক্যের বিকল্প নেই। স্বস্তির পরিবেশ তৈরির জন্য ফ্যাসিবাদের বিচারের ব্যাপারে প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য। একই সাথে শহীদ পরিবারের সামাজিক ও আর্থিক পুনর্বাসনের দ্রুত ব্যবস্থা করা দরকার, যারা আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন- তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে কোনো দ্বিমত জাতীয় ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত করবে নিঃসন্দেহে। বড়-ছোট সব দলই সংস্কারের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে। কোন দল কতটুকু ও কী সংস্কার করতে চাচ্ছে তা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের প্রস্তাবনাগুলো প্রিন্ট ও ইলেকট্র্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশ করা হলে জনসাধারণ এ ব্যাপারে প্রতিটি দলের অবস্থান বুঝতে পারবেন। সবাই যখন সংস্কার এবং নির্বাচনমুখী তখন সব দল এবং নেতার কাছ থেকে সহযোগিতা-সহমর্মিতা এবং শালীনতা দেশবাসী আশা করেন। এর ব্যত্যয়ে সাধারণ জনগণ লগি-বৈঠার এবং হেলমেট বাহিনীর ছায়া দেখতে পান- আতঙ্কিত হন। এই আতঙ্ক দূর করার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতাদের। পতিত নিপীড়ক সরকারের বিচারের প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করে। একই সাথে পরাজিত শক্তির পুনর্বাসনের তদবির ও কৌশল রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ ব্যাপারে প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ ও ঋদ্ধ নেতাদের সহনশীল এবং আরো সযতœ ভূমিকা জাতির প্রত্যাশা। এত প্রাণ এবং রক্ত দেয়া শুধু ক্ষমতার হাতবদলের জন্য ছিল না- এটি রাজনৈতিক নেতারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে গণতন্ত্রায়নের সব চেষ্টা অর্থহীন হবে, ফ্যাসিবাদ ফেরার পথ প্রশস্ত হবে।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ