চানখালির চন্দ্রনাথ বসাক বাবুর মন প্রায়ই খারাপ থাকে। বিশেষ করে বাজেট পেশ ও পাসের সময়। তিনি এখন নিজের গ্রামের বাড়িতে বাস করেন। আগে সচিবালয়ে, যেখানে বাজেট বানানো হয়, কাজ করতেন। ষোলো বছর আগে অবসর নিয়ে এখন অজপাড়াগাঁয়ে থাকলেও বাজেটের মাসে তার হাত-পা, মন মতি গতি বাজেট বাজেট জাতীয় বেদনা ব্যারামে ভোগে। তিন অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার প্রস্তুতির শুরু থেকে বিজি প্রেসে যাওয়া পর্যন্ত বাজেটের শরীর স্বাস্থ্য দেখভাল করতে হতো তাকে। বাজেট অনুবিভাগের বিশ্বস্ত কর্মকর্তা ছিলেন তিনি।
কত কথা কত স্মৃতি তার মনে পড়ছে। বাজেট দলিল দস্তাবেজ বক্তৃতা এখন কম্পিউটারে কম্পোজ করা যায়, নানান পরিবর্তন, পরিবর্ধন এক নিমেষে করা যায়, নানান কায়দায় কপি পেস্ট সেভ করা যায়, এখানে সেখানে দেয়া নেয়াও করা যায়। বাবুরা সত্তর আশির দশকে যখন বাজেট বানাতেন তখন হাতে লিখে টাইপ করে কার্বন কপিতে কারেকশন করতে হতো। কত না ঝামেলা ঝক্কি। আর বিজি প্রেসে সিসার অক্ষরে কম্পোজ হওয়ার পর সেসবের প্রুফ রিডিং-এর মতো পণ্ডশ্রমের অন্ত ছিল না। বাজেট-বিবরণী প্রতিবেদন সারণি ফিগার গ্রাফ বারবার মিলাতে হতো। সামান্য ভুল হলেও তা ঠিক করতে গলদঘর্ম হতে হতো। এখন বাহারি রঙ ডিজাইন গ্রাফিক্সে অতি আধুনিক টেকনিকে ছাপানো যায়।
এখন মিডিয়া আগেভাগেই বাজেটের আকার প্রকার জেনে যায়, তারাও নানান ভঙ্গিতে বাজেটের আকার, বরাদ্দের প্রকার প্রকৃতি সবই প্রকাশ করে ফেলে। বলা যায়, মিডিয়াই বাজেটকে বাঁচিয়ে রাখছে, জনমত প্রকাশের উপায় উপলক্ষকে প্রেরণা জোগাচ্ছে। সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আগে বাজেট বক্তৃতার কপি কারো পড়ার সুযোগ ছিল না। এখন শোনা যায় বাজেট বক্তৃতার কপি ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। বাজেট পাস ও পেশের পর্দাপুশিদা এখন আর যেন থেকেও নেই। আজকাল আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই) নামে কোনো এক বিদেশী চাচা আর তার ভাতিজা চ্যাট জিপিটি তারা নাকি ম্যাক্রো মাইক্রোÑ সব পরিস্থিতি পরিবেশের আগাম বার্তা বের করতে পারে। এই এআই এখন বিশ্বকাপে কোন দলের কী অবস্থান হবে সেটি আগাম বলে দেয়ার সাহস দেখাচ্ছে। অর্থনীতির ম্যাক্রো মাইক্রোর মানসম্মান গঠন ও মেরামতের সবকিছু এআইয়ের আওতায় চলে আসার যুগ শুরু হয়েছে। চন্দ্রনাথ বাবু ভাবেন তাদের সময় যদি এসব মিলত তাহলে তার চাকরি অনেক আগে শেষ হয়ে যেত। এনবিআর-এর অটোমেশন হওয়ার বিলম্বের কারণ খুঁজতে গিয়ে বসাক বাবু পেয়ে যান এ-জাতীয় বেশ কিছু ইঙ্গিত।
বসাক বাবু বাজেট উইংয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অনুন্নয়ন দুটো খাতের বরাদ্দ ও ছাড়ের কাজ দেখতেন। এখন নাকি তা খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে দেয়া হয়েছে। বসাক বাবুর বন্ধু বাজেট উইংয়ের রশিদ মিয়াও এখন অবসরে। রশিদ মিয়া এবারের স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ডাবল করা হয়েছে বলে বসাক বাবুকে জানান। পত্রিকা পড়ে রশিদ জানালেন, ‘নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী, যা গত বছরের বরাদ্দের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন তিনি। বরাদ্দের এই পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.০২ শতাংশ। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ।
মন্ত্রীর মতে , ‘ফ্যাসিবাদী সময়ে’ স্বাস্থ্য খাতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণ ক্রয়ে যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তার একটি বড় অংশই ‘দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট’ করা হয়েছে। তাই ম্যাক্রো লেভেলে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন হয়নি, হয়নি মাইক্রো লেভেলেও। সে কারণে বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে। সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক রোগী বিদেশমুখী হওয়ায় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। মাননীয় মন্ত্রীর ভাষায়, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হলো, সর্বজনীন ও ন্যায়সঙ্গত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা; চিকিৎসাকেন্দ্রিক থেকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রূপান্তর; গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া; মাতৃ, শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান জোরদার এবং স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও চিকিৎসাশিল্পের বিকাশ ঘটানো।
জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে।
সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করা হবে, করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকবে। রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবে জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক গঠন করা হবে। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের খর্বকায় হওয়া মোকাবেলায় বহুমুখী ও বহু-খাতভিত্তিক সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, শিল্প-পার্কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণা, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ওষুধশিল্পের ধারাবাহিক বিকাশ, উদ্ভাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান আরো সুদৃঢ় করতে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা ও সহায়ক নীতিগত সুবিধা দেবে সরকার।
ওষুধ ও বিভিন্ন রোগের টিকা সরবরাহে গুরুত্ব দিয়ে, ‘দেশব্যাপী একটি টেকসই ও আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং টিকা পৌঁছানো সম্ভব হয়। ‘ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি’, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং এআইভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা হবে। দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা, পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং নার্সিং বিষয়ে ব্যাচেলর ও মাস্টার্সের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী। স্থানীয় ও বৈদেশিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য চার মাস মেয়াদি ‘জেনারেল কেয়ারগিভার’ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেয়া হয়েছে বলেও বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে।
এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের ‘প্রাপ্তি’ নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জিডিপির হিসাব অনুসারে বাজেট খুব ভালো না হলেও আগের তুলনায় বরাদ্দ বৃদ্ধিটা ইতিবাচক। বাজেটে গ্রাম পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়াও ভালো দিক। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জায়গা সঠিক না হলে শহরের হাসপাতালে চাপ বাড়ে। সে দিক থেকে এবার বাজেটে ভালো কিছু সূচক দেখা গেছে। শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো বা জিনিসপত্র ক্রয়ে অর্থ বরাদ্দ করা হলে, তা খুব বেশি কার্যকর হয় না।
এ পর্যায়ে রশিদ মিয়া স্বাস্থ্য খাতের একটি মাইক্রো পরিস্থিতি বা ঘটনার কথা তুলে ধরেন। হোয়াটসঅ্যাপ সংলাপে রশিদ ও বসাক বাবুর আলাপচারিতা নিম্নরূপ :
রশিদ : দাদা জানেন কি ঢাকার বেসরকারি খাতের একটি মা ও শিশু হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার?
বসাক : বলেন কী? কেন, কিভাবে?
রশিদ : হাসপাতালে সেবা ত্রুটির কারণে ছয়টি নবজাতক শিশু স্বল্পসময়ের ব্যবধানে মারা যায়। সরকার তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শোকজ করে, তাদের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
বসাক : এই ব্যবস্থা আপাত দৃষ্টিতে বেশ প্রশংসনীয়। অন্তত নজির হিসেবে থাকবে যে, সরকার স্বাস্থ্যসেবা খাতে মনিটরিং জোরদার করেছে।
রশিদ : হ্যাঁ দাদা, এটি একটি দেখবার মতো বিষয় যে, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ। তবে সমস্যা কি জানেন, এই তৎপরতা অতীতে যারা করেননি, কিংবা আশপাশে যারা করছেন না বা করবেন না তাদের প্রতি বার্তা দেয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠছে। দুর্মুখেরা ছয় শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুতে কর্তৃপক্ষ যেভাবে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে সেই কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় গেল তিন-চার মাসে হামে অসংখ্য শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে ম্যাক্রো লেভেলে করণীয় সম্পর্কে দায়িত্ব অবহেলাকারীদের তো নিদেনপক্ষে নিজে নিজে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমীচীন ছিল, নয় কি?
বসাক : তা ঠিক! ছোট গাফিলতিতে বড় শাস্তি হয়ে গেল। অন্যকে সাবধান করার জন্য এটা ঠিক আছে; কিন্তু এখানে নিজেদের দায়িত্বহীনতার শাস্তি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পাওয়া যুক্তিসঙ্গত হচ্ছে কি? হাসপাতালে টেকনিক্যাল ত্রুটি ব্যবস্থাপনা পরিদর্শন ও প্রতিকারের পদক্ষেপ যদি নিয়মিত দেখভালের আওতায় থাকত তাহলে স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক অব্যবস্থাপনার হাল বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছাত না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয় উল্লেখ করেছেন সেটি। এটা ঠিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে ম্যাক্রো লেভেলে অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা হরহামেশা ঘটছে, সেখানে মাইক্রো লেভেলে ‘অ্যাফরডেবল কস্ট’-এ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং পরিচালিত একটি হাসপাতালে টেকনিক্যাল ত্রুটি ও ব্যবস্থাপনার অবহেলা গোচরে আসার সাথে সাথে হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নিলেও তাদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে এটাও বিবেচনায় আসা উচিত যে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বল্প খরচে স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল থাকার ব্যবস্থাটা অতি গুরুদণ্ড দিয়ে বঞ্চিত করা হচ্ছে কি না। ছয় শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রেক্ষাপট তদন্ত করে সেখানকার একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে লাইসেন্স বাতিলের মতো সিদ্ধান্তটি স্বাগত জানানোর মতো হলেও বিষয়টি বেসরকারি খাতের একটি হাসপাতালের জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখা এবং সরকারি হাসপাতালের বেহাল অবস্থা এবং বেসরকারি খাতের অপরাপর হাসপাতালে বাণিজ্যিক ব্যবসায়-ভারাক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিহীনতা ও ভূরি ভূরি দায়িত্বহীনতার বিবরে কতখানি সমীচীন তা বলা মুশকিল।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এবং জাপানে বাংলাদেশের প্রাক্তন বাণিজ্য দূত