রাজপথে তৎপরতা বাড়াচ্ছে নিষিদ্ধ আ’লীগ
রাজনৈতিক বোদ্ধারা কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করবেন। ভারতকে এড়িয়ে চীন সফরের বিষয়টা প্রতিবেশী দেশটি ভালোভাবে নিচ্ছে না। সেজন্য সেখানে অবস্থান করা পলাতক নেতাকর্মীদের যোগসাজশ ও পরামর্শে প্রতিবেশী রাষ্ট্র তাদের এজেন্ট দিয়ে এদেশে একটি বড় ধরনের নাশকতা ঘটাতে তৎপর রয়েছে। সেদিক দিয়ে আত্মগোপনে থাকা পতিত দলের নেতাকর্মীদেরও তাদের পলাতক হাইকমান্ড রাজপথে তৎপরতা বাড়ানোরও নির্দেশ দিয়েছেন। সেজন্য হঠাৎ করে রাজপথে এই অস্বাভাবিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Printed Edition
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতনের পর শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের বিদেশে পালানো এবং দেশের মধ্যে আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় রাজপথে আর দাঁড়াতে পারেনি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হাতেগোনা ছোটখাটো ঝটিকা মিছিল বের করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার চেষ্টা করে আত্মগোপনে থাকা কিছু নেতাকর্মী। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে। নির্বাচিত সরকার গঠন হওয়ার কয়েক মাসের মাথায় ধীরে ধীরে তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে পতিত দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকা, বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঝটিকা মিছিল বের করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির নেতাকর্মীরা। আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন হঠাৎ করে সংগঠিত হয়ে মুখে কালো কাপড় বেঁধে ঝটিকা মিছিল বের করে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। এরপর ওই মিছিল ও মানববন্ধনের ছবি এবং ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে রাজনীতিতে হাইপ তোলার চেষ্টা করা হয় বলে সূত্রে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে মাঝে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে যেমন উত্তরা এবং মহাখালীর মতো এলাকায় ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাজপথে তৎপরতা চালানোর খবর পাওয়া গেছে। শীর্ষ নেতারা পলাতক থাকলেও হঠাৎ এমন ঝটিকা মিছিল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৎপরতা বৃদ্ধির পেছনে উদ্দেশ্য হলো জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। রাজনৈতিক বোদ্ধারা কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করবেন। ভারতকে এড়িয়ে চীন সফরের বিষয়টা প্রতিবেশী দেশটি ভালোভাবে নিচ্ছে না। সেজন্য সেখানে অবস্থান করা পলাতক নেতাকর্মীদের যোগসাজশ ও পরামর্শে প্রতিবেশী রাষ্ট্র তাদের এজেন্ট দিয়ে এদেশে একটি বড় ধরনের নাশকতা ঘটাতে তৎপর রয়েছে। সেদিক দিয়ে আত্মগোপনে থাকা পতিত দলের নেতাকর্মীদেরও তাদের পলাতক হাইকমান্ড রাজপথে তৎপরতা বাড়ানোরও নির্দেশ দিয়েছেন। সেজন্য হঠাৎ করে রাজপথে এই অস্বাভাবিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, রাজনৈতিক কার্যক্রম ও প্রকাশ্যে শোডাউন নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো বিভিন্ন স্থানে ‘ঝটিকা মিছিল’ এবং তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে পতিত দলের আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা হঠাৎ করে রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সূত্র বলছে, তৃণমূলের জন্য এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ বার্তা হলো দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরে আসার বিষয়ে শেখ হাসিনা এখন অনেকটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি তার মনোভাবের কথা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। পতিত আওয়ামী লীগ প্রধান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিনি ভারত সরকারের সাথে প্রয়োজনীয় আলোচনা শেষ করেছেন এবং দেশে ফেরার বিষয়ে নিজের ইচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ সম্পর্কে দিল্লিকে অবহিত করেছেন। দলীয় প্রধানের পক্ষ থেকে তৃণমূলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার জন্য এই ধরনের বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে এবং সেইভাবে প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে। তৃণমূলের কয়েকজন নেতার সাথে আলাপকালে তারা এ প্রতিবেদককে দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন, নেত্রী দেশে ফিরবেন, বীরের বেশে। হযরত শাহজালাল (রহ) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফিরবেন, তাকে স্বাগত জানাতে লাখো নেতাকর্মী সেখানে জড়ো হবেন। তবে কখন কিভাবে দেশে ফিরবেন এ বিষয়টা তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কেউই নিশ্চিত নন বলে জানা গেছে। বলা হচ্ছে, নির্দেশ পেলেই তারা রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। হাইকমান্ড থেকে তৃণমূলের প্রতি দেয়া বার্তায় বলা হয়েছে, এবারের সংগ্রাম শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম। এই লক্ষ্য নিয়ে নেতাকর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। দলের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আপা দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরতে চান। তিনি যেভাবে ভারতে গিয়েছিলেন, সেভাবেই বীরদর্পে জনগণের মাঝে ফিরে আসবেন। তার ফিরে আসা উপলক্ষে বিপুল জনসমাগম করার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
সোশ্যাল মিডিয়ায়ও এ ধরনের বক্তব্য বেশ কিছুদিন হলো পতিত দলটির অনলাইন অ্যাক্টিটিভিস্টদের অ্যাকাউন্ট থেকে ফটোকার্ড তৈরি করে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রেফতার এড়িয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কর্মসূচি পালন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যদিও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নাশকতারোধে এবং বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করার জন্য ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার জন্য নোটিশ জারি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, দেশটা ভালোভাবে চলুক এটা কখনোই চাইবে না নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। এ জন্য মাঝে মাঝে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়, ঝটিকা মিছিল করে তাদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার চেষ্টা করে। তবে বেশ কিছুদিন হচ্ছে তাদের তৎপরতা অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটির লক্ষণ ভালো মনে হচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিশ্চয় ভারত ভালোভাবে নিবে এটা মনে হওয়ার কোনো কারণ দেখছি না। ভারতকে এড়িয়ে চীনকে সরকার কাছে টানছে, তাদের সাথে তিস্তাসহ কয়েকটি বড় চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে এ বিষয়টি নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। এ জন্য তারাও এ দেশে অস্থিতিশীলতা হোক সেজন্য কাজ করতে পারে। এ দেশে তাদের অনেক এজেন্ট রয়েছে যারা সর্বাত্মকভাবে ভারতকে সহযোগিতা করে থাকে।