সর্ষের মধ্যে ভূত
মিল্কভিটাই এখন ভেজাল দুধের কারিগর
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডের (মিল্কভিটা) বিরুদ্ধে ভেজাল দুধ বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কমিটি ও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রাণঘাতী এ কাজে জড়িত বলে জানা গেছে।
মিল্কভিটা সূত্রে জানা যায়, দুধের খামার সংশ্লিষ্ট সমবায়ীদের মাধ্যমে পরিচালিত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই লাখ লিটারের বেশি দুধ বাজারজাত করে থাকে। যা দেশের মানুষের দুধের চাহিদার একটি বিরাট অংশ পূরণ করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা খামার থেকে এ দুধ সংগ্রহ করা হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মিল্কভিটার বিরুদ্ধে নকল দুধ বা ভেজাল দুধের কোনো রেকর্ড ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি মিল্কভিটার বিরুদ্ধে বাজারে ভেজাল দুধ সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, ডিটারজেন্ট, তেল ও সোডা মিশ্রত করে কৃত্রিম উপায়ে দুধ তৈরি করা হয়। এরপর সেই দুধ মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চল হতে কিছু খামারি কারখানা ম্যানেজার ও ঘোষ সমিতির যোগসাজশে মিল্কভিটার মিরপুর কারখানায় পাঠায়। পরে সেখান থেকে বাজারজাত করা হয়। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে সাতক্ষীরায় একজন ঘোষকে ভেজাল দুধ তৈরির সাথে জড়িত থাকায় সাজাও দেয়া হয়। কারখানার পরীক্ষায় ওই দুধ ভেজাল হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথা থাকলেও কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তা উতরে যায়। মিরপুর কারখানার কোয়ালিটি ম্যানেজার ও প্রোডাকশন ম্যানেজার এ কাজে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কয়েক লাখ লিটার নকল দুধ বাণিজ্য করে তারা কয়েক কোটি টাকা ভাগ বাটোয়ারা করেছেন।
জানা যায়, গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে মিল্কভিটায় এ ভেজাল দুধের সয়লাব শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ এক তদন্ত সূত্রে জানা যায়, গত বছরের মে মাসে ৭৩ হাজার ২৪০ লিটার, জুনে ৩৪ হাজার ২৯৭ লিটার, জুলাইয়ে ২৫ হাজার ৬৩০ লিটার, আগস্টে ২৯ হাজার ১০৫ লিটার এবং সেপ্টেম্বরে ৩৮ হাজার ৮৯০ লিটার ভেজাল দুধ শনাক্ত করা হয়। এ সময় কর্মচারীদের প্রতিবাদের মুখে কিছু ভেজাল দুধ ড্রেনে ফেলে দিতে বাধ্য হয়। এরপর ভেজাল দুধ প্রকাশ্যে বাজারজাত না করলেও গোপনে নানা উপায়ে মিল্কভিটার নামে বাজারজাত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সমবায়ীদের এ প্রতিষ্ঠানে নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডার জাহিরুল আলিমকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তাদের মেয়াদ ছিল চার মাস। সমবায়ীদের নিয়ে নির্বাচন দেয়া ছিল তাদের মূল দায়িত্ব। কিন্তু তারা ব্যর্থ হন। পরে আরো চার মাস মেয়াদ বাড়ানো হয়। সমবায়ীদের এ প্রতিষ্ঠানে তারা আবারো নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হয়। পরে আবারো জাহিরুল আলিমকে রেখেই এক বছরের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে এ কমিটিতে থাকা কেউই সমবায়ী নয় বা কমিটিতে ঢুকতে নামকাওয়াস্তে সমবায়ী সেজেছেন। যার মধ্যে জেলখাটা যুবলীগ নেতার স্ত্রীও রয়েছেন। ফলে মিল্কভিটা কার্যত বাইরের লোক দিয়ে দখল করে ফেলা হয়েছে। এ কমিটি নিয়মের বাইরে অনেক কাজ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান (২০০৩-২০০৬) আব্দুর রাজ্জাক নয়া দিগন্তকে বলেন, মিল্কভিটার দুধ বাজারে ৯৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি করা হয়। কিন্তু সমবায়ীদের দেয়া হয় মাত্র ৪৬ টাকা। আগে সমবায়ীদের মিল্কভিটা থেকে বিভিন্ন রকম সহযোগিতা করা হতো। কিন্তু এখন কোনো সহযোগিতাই করা হয় না। দাম কম পাওয়া ও সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে খামার সংখ্যা কমে এখন দুধ সরবরাহও কমে গেছে। এজন্য এখন নকল দুধ বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। এভাবে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। বর্তমান কমিটিতে থাকা চেয়ারম্যানসহ যারা আছেন তারা কেউই সমবায়ী না। তারা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে একটি সমবায়ী প্রতিষ্ঠান দখল করে রেখেছেন। তাদের অবিলম্বে অপসারণ করা উচিত।