বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধই রইল নতুন কমিটি

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন করে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত ২৭টি ক্রীড়া ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে এসব কমিটিকে আগামী তিন মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। তবে কমিটি নিয়ে তেমন সুখবর নেই। অর্থ নিয়ে কমিটিতে বহাল থাকা কিংবা কমিটিতে স্থান করে নেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েই গেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত কমিটিগুলোকে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবে নানা প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক জটিলতায় অধিকাংশ ফেডারেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সেই কমিটিগুলোর পরিবর্তে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন করে নির্বাচনের জন্য নতুন সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। তবে তিন মাসের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটিগুলোর আকার নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। অধিকাংশ ফেডারেশনে ২৭ থেকে ২৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য স্বল্প মেয়াদে গঠিত অনেক অ্যাডহক কমিটিই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বহু বছর দায়িত্বে থেকে গেছে। এবারো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে প্রশ্ন রয়েছে।

ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর অ্যাডহক কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন সাধারন সম্পাদক ফোরামের সভাপতি এমএ কুদ্দুস খান ও সাধারন সম্পাদক দিলদার হাসান দিলু। তাদের নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা অজানা কারণে বক্সিংয়ের সাধারন সম্পাদক পদে সেই কুদ্দুস এবং উশুর ওই পদে জায়গা করে নিয়েছেন দিলু। এখানেই প্রমাণিত হয় কমিটি করার ক্ষেত্রে অনৈতিক অর্থ লেনদেনে সহযোগিতা করেছেন ওই দুই কর্মকর্তা।

প্রাথমিকভাবে ২৮টি ক্রীড়া ফেডারেশনে নতুন অ্যাডহক কমিটি দিয়েছে এনএসসি। কোনো কমিটি ২৯ সদস্যের আবার কোনো কমিটি ২৫ সদস্যের। ফলে অ্যাডহক কমিটির আকার নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। গুঞ্জন রয়েছে অর্থ দিয়ে পদ না পেলে কেলেঙ্কারি হতে পারে, তাই কমিটির আকারে কম বেশি হয়েছে; যে কারণে প্রশ্নবিদ্ধ এনএসসি।

তৎকালীন সচিব এবং পরে প্রধান নির্বাহী (ইডি) আমিনুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বিশেষ সময়ে (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) গঠিত কমিটির কোনো সময় সীমা থাকবে না। সরকার যত দিন মনে করবে তারা তত দিন থাকবে।’ তার পরও নতুন ঘোষিত কমিটির তালিকায় আগের কমিটিকে নির্বাচন আয়োজন না করতে পারার ব্যর্থতাকে দেখানো হয়েছে। যে ব্যর্থতার দায়ভার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদেরও রয়েছে। এই ঘটনাকে অনেকেই নীতিবহির্ভূত বলছেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর টেকনোক্র্যাট কোটায় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হন সাবেক তারকা ফুটবলার আমিনুল হক। চেয়ারে বসেই তিনি দেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্য চিহ্নিতকরণ, সমস্যা নিরসন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে সুপারিশ প্রদানে কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটিই মূলত ক্রীড়া ফেডারেশনের নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের সুপারিশ করে। তাই নতুন কমিটি নিয়ে তিনিও দায় এড়াতে পারেন না।

প্রথম দফায় ২৮টি ক্রীড়া ফেডারেশনে নতুন অ্যাডহক কমিটি দিয়েছে এনএসসি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেয়া সাতজন সাধারন সম্পাদক পদেই বহাল রয়েছেন।

বহাল আছেন সাতজন

বক্সিংয়ে এম এ কুদ্দুস খান, উশুতে দিলদার হাসান, জিমন্যাস্টিক্সে হাবিবুর রহমান জামিল, কুস্তিতে মেসবাহ উদ্দিন আজাদ, হ্যান্ডবলে সালাউদ্দিন আহমেদ, রাগবিতে আখতার জামান ও টেনিসে ইশতিয়াক আহমেদ কারেন।

সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন এসেছে

কাবাডিতে নিজের পদ ধরে রাখতে পারেননি অতীতের কমিটিকে খুশি করে সাধারণ সম্পাদক হওয়া নেওয়াজ সোহাগ। সে সময় গুঞ্জন ছিল অর্ধকোটি টাকা ব্যায়ে ওই পদটি বাগিয়ে নিয়েছিলেন। নতুন কমিটিতে সেক্রেটারি হয়েছেন ইসরাইল হাওলাদার। এ ছাড়া অ্যাথলেটিকসে অ্যাডভোকেট আলী ইমাম তপন, ক্যারমে আজহারুল ইসলাম কনক, খো খোতে রায়হান উদ্দিন ফকির, জুডোতে নয়না চৌধুরী, টেবিল টেনিসে সাইদুল হক সাদী, তায়কোয়ান্দোতে মাহমুদুল ইসলাম রানা, দাবায় গ্রান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ, ফেন্সিংয়ে কাজী সাইফুল হক, ব্যাডমিন্টনে কাজী হাসিবুর রহমান, ভলিবলে আবদুল মুমিন সাদ্দাম, ভারোত্তোলনে এস এম কাজল, মহিলা ক্রীড়া সংস্থায় শারমিন আক্তার রতœা, রোইংয়ে সাইফুদ্দিন আলী, শুটিংয়ে সাকিফ শামীম, সাইক্লিংয়ে পারভেজ হাসান, আরচারিতে সৈয়দ তানভীর, সুইমিংয়ে সৈয়দ আমিনুল হক দেওয়ান সজল, কারাতেতে সৈয়দ নুরুজ্জামান সিনথিয়া এবং হকিতে ইশতিয়াক সাদেক।

বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধ

সাবেক শুটার শারমিন আক্তার রতœা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদিকার পাশাপাশি শুটিংয়ে যুগ্ম সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও রয়েছেন। অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনে রাখা হয়নি সাবেক তারকা অ্যাথলেট ও কোচ মো: ইয়াহিয়াকে। কারাতে ফেডারেশনের সদস্য করা হয়েছে বাশাআপ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক ও সাবেক তারকা মার্শাল আর্ট খেলোয়াড় খালেদ মনসুর চৌধুরীকে। অনৈতিক অর্থ লেনদেনে সাবেক এক তারকা ফুটবলারকে সহযোগিতা করার দায়ে অভিযুক্ত আবদুল মুমিন সাদ্দামকে রাখা হয়েছে ভলিবলে। আশিকুর রহমান মিকু কিংবা বিমল ঘোষন বুলুকে রাখা হয়নি ভলিবলে। আর সাঁতারের সাধারন সম্পাদক পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংগঠক অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা সৈয়দ আমিনুল হক দেওয়ান সজল নিজেই। আবদুল্লাহ ফুয়াদ নিজে দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকায় ময়মনসিংহ বিভাগের অনেকেই সুযোগ পেয়েছেন নতুন কমিটিতে।

এসব সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে দেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্য চিহ্নিতকরণ, সমস্যা নিরসন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে সুপারিশ প্রদানে কমিটির সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদোয়ান বলেন, ‘মহিলা ক্রীড়া সংস্থা ও শুটিং আলাদা। দুই জায়গাতেই থাকতে পারেন রতœা। এতে কোনো সমস্যা নেই।’ সাধারণ সম্পাদক পদে আটজনের থেকে যাওয়ার বিষয়ে তার কথা, ‘সবাইকে তো আর পরিবর্তন করা যাবে না।’