সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিতে ইসিকে কঠোর হতে হবে

ইডব্লিউএর আলোচনায় বক্তাদের অভিমত

Printed Edition
back-4
জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনা : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) আরো কঠোর, দৃঢ় ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেন, এই নির্বাচন দেশের টেকসই গণতন্ত্র, সুশাসন, উন্নয়ন এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গতকাল রোববার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে ‘সহিংসতামুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতকরণ : নির্বাচন কমিশন ও সরকারের আবশ্যিক করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা।

বক্তারা জানান, ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, সহিংসতা, নারীর প্রতি আক্রমণ ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক বাধাদানের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এসব পরিস্থিতি একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে গভীর শঙ্কা তৈরি করছে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ও ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্সের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. মো: শরিফুল আলম। অ্যালায়েন্সের পক্ষে মাঠপর্যায়ের তথ্য উপস্থাপন করেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান।

তিনি জানান, সারা দেশে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, নারীর প্রতি সহিংস হামলা, অবমাননা ও অন্যান্য সহিংসতার অন্তত ২৭৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনা ৩৬টিরও বেশি জেলায় বিস্তৃত। তার ভাষ্য মতে, এই প্রবণতা ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত এবং কাঠামোগতভাবে পুনরাবৃত্তিমূলক, যা নির্বাচনী পরিবেশের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নষ্ট করছে এবং প্রার্থী, প্রচারক ও ভোটারদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

আলোচনায় বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. তৌফিক এম হক, প্রফেসর ড. ওয়ারেসুল করিম বুলবুল, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী ও আব্দুল মোতালেব সরকার, সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ, সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মিলি রহমান এবং ইডব্লিউএর ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়াসহ অনেকে।

ড. তৌফিক এম হক বলেন, মাঠপর্যায়ে নির্বাচনী আমেজ থাকলেও ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হলে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হবে। তিনি ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, জনগণের অংশগ্রহণই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে। এজন্য ইসিকে এখনই শক্ত ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে, অন্যথায় কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

সাবেক কূটনীতিক আব্দুল মোতালেব সরকার বলেন, এই নির্বাচন শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তিনি ইসির পূর্ববর্তী ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।

বক্তারা সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বাহিনীকে নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তারা সতর্ক করে বলেন, অতীতের কমিশনগুলোর মতো ব্যর্থ হলে বর্তমান কমিশনকেও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।

বক্তারা আরো বলেন, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর জনগণ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু গত দুই দশকে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে মানুষ সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারেনি। তাই এবারের নির্বাচনকে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে।

তাদের মতে, বর্তমানে সারা দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘন, কালো টাকার ব্যবহার, নারীর ওপর সহিংসতা ও বুলিং, বিরোধী প্রার্থীদের প্রচারে বাধা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

সভাপতির বক্তব্যে ড. শরিফুল আলম বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু কমিশন এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমানভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি বলেন, ইসির দৃঢ় অবস্থান ছাড়া মাঠপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এখনো সময় আছে, ইসিকে কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে।