এবনে গোলাম সামাদ

আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের অগ্রপথিক

Printed Edition
Sahitto-3
আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের অগ্রপথিক

ড. আহমেদ ইমতিয়াজ

শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ডক্টর এবনে গোলাম সামাদ স্যার আমার শিক্ষকদেরও শিক্ষক। আমি আমার যেসব সম্মানিত শিক্ষকদের দেখে তাদের পাণ্ডিত্যের কারণে এখনো জড়সড় হয়ে যাই, সেসব শিক্ষককেও দেখেছি সামাদ স্যারের সামনে কতটা অসহায় ও আত্মবিশ^াসহীন। জ্ঞান চর্চার আলাপচারিতায় স্যারের সামনে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এমন মনোবল বা আত্মবিশ^াস সম্পন্ন মানুষ খুব একটা চোখে পড়েনি।

স্যারের পাণ্ডিত্য, দূরদৃষ্টি, চিন্তার বিষয়বস্তু ও সামর্থ্য, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, যুক্তিতর্কের প্রাজ্ঞতা, লেখনীর সক্ষমতাসহ যেকোনো বিষয়ে মন্তব্য করার স্পর্ধা আমার নেই। তবে একই পত্রিকায় একই দিনে স্যারের লেখার পাশাপাশি আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেখে একাধিকবার অসীম পুলকিত বোধ করেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে সামাদ স্যারের ক্লাস পাইনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হবার পূর্বেই স্যার অবসরে গেছেন। তবে বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত স্যারের বিদায় অনুষ্ঠানটি দেরিতে হওয়ায় সেই অনুষ্ঠানে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অবসরে গেলেও বেশ কয়েকবার স্যারকে বিভাগে পেয়েছি। অগোছালো উষ্কখুষ্ক চুলে কিছু বই বুকের সাথে চেপে নিয়ে তাকে চলতে দেখেছি। সরাসরি কাছ থেকে জ্ঞানের স্পর্শ নেয়ার সৌভাগ্য না হলেও দুই-চার বার স্যারের সাথে ক্ষণিকের জন্য কথা বলার সুযোগ হয়েছে। পত্রিকায় স্যারের লেখা কলাম প্রায়শই মনোযোগ সহকারে পড়েছি। স্যারের লেখা বেশ কয়েকটা বই পড়ার সৌভাগ্যও হয়েছে। সর্বোপরি, স্যার সম্পর্কে বেশ কিছু গল্প কথা বিভিন্ন মানুষের কাছে শুনেছি। সব মিলিয়ে সামাদ স্যার আমার কাছে লাইব্রেরিতুল্য শুধু একটি তথ্যভাণ্ডারই নয় বরং একটি কৌতূহল, একটি রহস্য। বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তর জানাশোনা থাকলে তাকে জ্ঞানী বলা যেতে পারে, কিন্তু সংগৃহীত জ্ঞান যথাযথ তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ বিদগ্ধ পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পারাটা একটা ভিন্ন প্রতিভাসম্পন্ন মেধার বহিঃপ্রকাশ। নিজস্ব অভিমত এবং যুক্তিতর্ক প্রকাশ করার একটি ব্যতিক্রমী স্বভাব স্যারের মধ্যে আছে বলে আমার মনে হয়। আর তা হলো তিনি সব সময়ই বিপরীত বা প্রতিপক্ষ হয়ে যুক্তিতর্ক করতে পছন্দ করেন।

সামাদ স্যার নিজের সম্পর্কে খানিকটা বেখেয়ালি, উদাসীন ও আত্মভোলা প্রকৃতির মানুষ। স্যার সম্পর্কে কিছু গল্পকথা বিভিন্ন মুখে শুনেছি। যেমন স্যার নিয়মিত লাইব্রেরিতে দীর্ঘসময় ধরে পড়াশুনা করতেন। একদিন নাকি লাইব্রেরিতে স্যার পড়াশুনা করছিলেন। রাত হয়ে গেছে। কর্মচারীরা কিছুক্ষণ পরপর স্যারকে জানাচ্ছিলেন লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাবার কথা; কিন্তু স্যার প্রতিবারই বলেন, আর দশ মিনিট (আর কিছুক্ষণ)। এক পর্যায়ে কর্মচারীরা স্যারকে ভিতরে রেখেই লাইব্রেরি বন্ধ করেন। শিফ্টিং ডিউটিতে কর্মচারী পরিবর্তন হয়। ভিতরে যে স্যার আছেন, নতুন ডিউটিতে আসা কর্মচারীরা তা জানত না। এ ভাবেই রাত কেটে যায়। সকালে লাইব্রেরি খুলে ভিতরে স্যারকে পড়তে দেখে তারা ভীষণ ভয় পায় এবং স্যারের কাছে ছুটে গেলে স্বভাব সুলভভাবে স্যার বলেন, আর দশ মিনিট (আর কিছুক্ষণ)। আবার, সাহেব বাজারে গাড়ি রেখে বাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন। বিকালে/সন্ধ্যায় ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে দেখেন বাহিরে গাড়ি নেই। ভুলে গেছেন যে গাড়িটি তিনি সাহেব বাজারে রেখে এসেছেন। এমতাবস্থায় তিনি অভিযোগ নিয়ে থানায় চলে গেছেন যে গাড়ি চুরি হয়েছে। স্যারের কয়েকজন প্রিয় ছাত্রের ফেসবুকের লেখায় পড়েছি এরশাদ আমলে তিনি নাকি পরিকল্পনামন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব পেয়েও না বলেছিলেন। কারণ, তার মূল্যায়ন ছিল এরকম যে তাকে গাধার দলে পালের সোভা হয়ে থাকতে হবে। ক্যাম্পাসে হাঁটাহাঁটির অধিকাংশ সময় চিনা বাদাম চিবানো, শার্ট ইন করে স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরা নাকি স্যারের নিত্য অভ্যেস ছিল। জানি না এসব গল্পের কতটুকু সত্য।

তিনি বাংলাদেশের একজন নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক, প্রথিতযশা জ্ঞানতাপস, বহুমাত্রিক লেখক এবং কলামিস্ট। একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী তথা উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বা জীবাণুতত্ত্বের গবেষক হলেও তার পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞানগর্ভ মননশীল চিন্তার দূরদর্শিতা ইতিহাস, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, অর্থনীতি, রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, নৃতত্ত্ব, জাতিরাষ্ট্র, বিভিন্ন জাতিসত্তার স্বরূপ, বাংলাদেশের ইসলাম ও ঐতিহ্য, সমাজ-সংস্কৃতির ভৌগোলিক বিশ্লেষণে তিনি হয়ে উঠতে পেরেছেন সত্যিকার তথ্যভাষী। জাতি, উপজাতি, আদিবাসী, আরাকান সঙ্কট, কাশ্মির সমস্যাসহ হেন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে তিনি লেখালেখি করেননি। তিনি যেন এক ‘চলমান উইকিপিডিয়া’। তিনি প্রকৃতপক্ষেই একজন যুক্তিবাদী দার্শনিক যিনি অনেকের কাছে ‘বাংলার সক্রেটিস’ নামে পরিচিত। তার স্বদেশপ্রেমও নিখাদ ব্যতিক্রমী। ফ্রান্সের বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যাপনার আকর্ষণীয় সুযোগকে প্রত্যাখ্যান করে দেশে ফিরেছিলেন এই ভেবে যে, তিনি ফ্রান্সের গোলাম (গোলাম সামাদ) নয়, স্বদেশের গোলাম। তিনি ফরাসি স্ত্রী এবং নিজ সন্তানকে পর্যন্ত ত্যাগ করেছেন কিন্তু দেশপ্রেমের কারণে স্বদেশকে ত্যাগ করেননি।

আমার জানা মতে, সামাদ স্যার মাইকোলজি (ছত্রাকবিজ্ঞান) ও প্ল্যান্ট প্যাথোলজি (উদ্ভিদ রোগবিজ্ঞান) পড়াতেন। শুনেছি তিনি প্ল্যান্ট প্যাথোলজির অর্থ করতেন ‘উদ্ভিদের দুঃখ’ (প্ল্যান্ট মানে উদ্ভিদ আর প্যাথোজেন মানে দুঃখ)। তিনি এ কথাও বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে মানুষ জাতিই উদ্ভিদের দুঃখের মূল কারণ। তিনি ক্লাসের পুরো সময়টাই যে সিলেবাস থেকে পড়াতেন এমনটি নয়। বরং তিনি সিলেবাসভিত্তিক পড়াতেন কম কিন্তু এমন সব বিষয় নিয়ে কথা বলতেন বা আলোচনা করতেন যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার তৃষ্ণা, উপলব্ধি ও আগ্রহের দরজা খুলে দিতেন। শিক্ষার্থীদের বলতেন লাইব্রেরিতে যাও, একটার জায়গায় দশটা বই পড়ো, দশটা বিষয়ে জানো। এই একটা ক্ষেত্রে তিনি তাঁর নিজের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন। এমন বই তথা লাইব্রেরি প্রেমিক মানুষ সত্যিই বিরল। প্রথম জীবনে তিনি নাকি শিল্পী হতে চেয়েছিলেন, হতে পারেননি। হয়েছেন প্রকৃত ও সফল শিল্পবোদ্ধা। বিশেষ করে নিসর্গচিত্র, নকশা, গাছ ও লতাপাতার প্রাকৃতিক দৃশ্য তার খুব প্রিয়। মুসলিম চিত্রকলার উপর তার একটি মূল্যবান বই রয়েছে। নৃতত্ত্ব তার আরেকটি অতীব প্রিয় বিষয়। চিত্রকলা এবং নৃতত্ত্ববিদ্যার ওপর তার লেখা বই দুইটি বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে আছে বলে শুনেছি। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে স্যারের (ডক্টর এবনে গোলাম সামাদ) লেখা কয়েকটি বই হলো- ১. প্রাথমিক জীবাণুতত্ত্ব ২. নৃতত্ত্বের প্রথমপাঠ ৩. মানুষ ও তার শিল্পকলা ৪. বাংলাদেশ : সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি প্রতিক্রিয়া ৫. আত্মপরিচয়ের সন্ধানে ৬. আত্মপক্ষ ৭. বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি ৮. আমার স্বদেশ ভাবনা ৯. বায়ান্ন থেকে একাত্তর ১০. আমাদের রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা এবং আরাকান সঙ্কট ১১. ইসলামী শিল্পকলা ১২. শিল্পকলার ইতিকথা ১৩. বাংলাদেশে ইসলাম ১৪. বর্তমান বিশ্ব ও মার্কসবাদ ১৫. বাংলাদেশের মানুষ ও ঐতিহ্য ১৬. উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব ১৭. জীবাণুতত্ত্ব ১৮. উদ্ভিদ সমীক্ষা।

তিনি দীর্ঘ সময় বিভিন্ন সংবাদপত্রে নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তাতে অনেকেই নাকি বিশেষ মতাদর্শের গন্ধও পান। তবে যিনি যেটাই বলুন না কেন তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পক্ষে কিছুটা ইসলামী মূল্যবোধ বা চেতনার অনুকূলে লেখালেখি করছেন বলেই আমার মনে হয়। অবশ্য তিনি যা বলেন বা লেখেন এবং যা বিশ্বাস করেন তার মধ্যে কতটা মিল আর কতটা বৈপরীত্য তা কিন্তু নির্ণয় করা বেশ কঠিন। ব্যক্তিজীবনে ধর্মীয় অনুশাসন কতটা অনুসরণ করতে পেরেছেন তা নিয়ে ঢের বিতর্ক থাকলেও; তিনি লেজুড়বৃত্তিক চর্বিত আনুগত্যহীনভাবে ডানপন্থী লেখক হিসেবে বাংলাদেশের আত্মরক্ষামূলক জাতীয়তাবাদের পক্ষে এখনো কলম চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কলাম লেখক হিসেবেই বাংলাদেশে সমধিক পরিচিত। তার লেখায় গভীর ইতিহাস চেতনার ছাপ যেমন রয়েছে তেমনি মুক্তচিন্তার ছাপও বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। যা তার পাঠকের জন্য দারুণ আনন্দদায়ক উপাদান। দৃষ্টিভঙ্গিতে নৈর্ব্যক্তিকতা এবং চলনে বলনে রাজনৈতিক আনুগত্যের অভাব তার রচনাগুলোর বিশেষ আকর্ষণ, যা সচরাচর দেখা যায় না।