অর্ধলাখ বাংলাদেশী ঘরছাড়া কুয়েতে

বিদ্যুৎ পানির লাইন বিচ্ছিন্ন

Printed Edition
first-1
কুয়েতের হাসাবিয়া এলাকায় ঘরছাড়া বাংলাদেশীরা

মনির হোসেন

কুয়েতে চার দিন ধরে প্রায় অর্ধলাখ বাংলাদেশীসহ লাখো বিদেশী নাগরিক ঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুয়েত সরকারের পূর্বঘোষিত নির্দেশনা না মানার কারণেই এসব বিদেশীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশানে যেতে বাধ্য হয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে রাস্তায় রাত কাটানো প্রবাসী বাংলাদেশীরা বলছেন, বিদ্যুৎ-পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করার আগে তাদেরকে যদি আর একটু সময় দেয়া হতো তাহলে তারা অন্তত প্রয়োজনীয় মালামালগুলো সরিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। কিন্তু সেই সুযোগটিও তারা অল্প সময়ের জন্য না পাওয়ায় অনেক বাংলাদেশী তাদের পরিবার নিয়ে রাস্তায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এখন তারা কোথায়, কিভাবে নতুন করে বাসা ভাড়া নেবেন তা নিয়েই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

গতকাল শনিবার কুয়েত সিটি থেকে একজন বাংলাদেশী নয়া দিগন্তকে জানান, চার দিন আগে কুয়েত সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হাসাবিয়া আব্বাসিয়া এলাকা ঘিরে ফেলেন। তার আগে বিশাল ওই এলাকার প্রতিটি বাড়ির বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এরপর তারা ওই এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। যারা সুযোগ পেয়েছেন তারা তাদের মালপত্র বের করে রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে রেখেছেন। আর যারা বের করতে পারেননি তাদের মালামাল নিরাপত্তা বাহিনীই বের করে রাস্তায় রেখে দেন। এভাবে চার দিন ধরে ওই এলাকায় চলছে কুয়েত সরকারের বিরতিহীন অভিযান।

গতকাল সন্ধ্যার আগে খোলা রাস্তায় অবস্থান করা একজন প্রবাসী বাংলাদেশী নয়া দিগন্তকে তার সর্বশেষ অবস্থান জানিয়ে বলেন, কুয়েত সরকার গত ১২ বছর ধরেই হাসাবিয়া এলাকা খালি করার নির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন। তবে সেটি বাড়ির মালিকদের দিচ্ছিলেন। আমরা যারা ভাড়াটিয়া আছি তাদেরকে কখনো কুয়েত সরকার অথবা বাড়িওয়ালারা গুরুত্ব দিয়ে বলেননি। কেন এই এলাকা থেকে সরে যেতে বলছিল কুয়েত সরকার- এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই প্রবাসী বলেন, হাসাবিয়া এলাকার কাছেই এয়ারপোর্ট। এই এলাকাটি ডেভেলপ করবে বলে তারা জানিয়ে আসছিল। কিন্তু গত ১৬ জুলাই হঠাৎ করেই কুয়েতের পুলিশ ও আর্মি এসে আমাদের প্রত্যেক বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়ে প্রথমে বিদ্যুৎ লাইন এরপর পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেন। যখন এটি করা হয় তখন বাইরে তীব্র গরম। মানে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এই অবস্থায় এসি ছাড়া স্ত্রী সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকাটা কতটা যন্ত্রণার তা বলে বোঝাতে পারব না। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমরা কুয়েত সরকারের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে এভাবে আমাদেরকে ঘরছাড়া করা হবে তা কল্পনাও করতে পারছি না। এক কথায় অমানবিক। এই মুহূর্তের পরিস্থিতি কেমন জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রায় অর্ধলাখ বাংলাদেশী ছাড়াও লাখেরও বেশি বিদেশী নাগরিক খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছিল। তাদের অনেকেই এখন পুরো কুয়েতে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি ফ্যামিলি অন্য এলাকায় রেখে এখন এসেছি রাস্তায় থাকা মালপত্র নিতে। গাড়ি পেতেও কষ্ট হচ্ছে। যারা খোলা আকাশের নিচে রয়েছে তাদের অনেকেই বাসা খুঁজছে। কেউ এখানে-সেখানে বাড়ির ছাদে ও রাস্তায় অবস্থান করছেন। তাদের মধ্য থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় অনেককে একটি স্কুলে রাখার জন্য শেল্টার হোম খোলা হয়েছে- এমন তথ্যের জবাবে প্রবাসীরা নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদেশী লোক হবে কমপক্ষে এক লাখ। আর ওই স্কুলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে ১-২ হাজারের মতো। দূতাবাস থেকে এ বিষয়ে কুয়েত সরকারের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশীরা বলেন, এই দেশের সরকারের আইনের বিরুদ্ধে দূতাবাসের যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। তাই তারা কিছু বলছেন না।

কুয়েত সিটি থেকে অন্য এক বাংলাদেশী নয়া দিগন্তকে বলেন, ওই এলাকাটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদেরকে সরে যেতে কুয়েত সরকার অনেক আগে থেকেই নোটিশ দিয়েছিল। কিন্তু তারা কেউ সরকারের নোটিশকে আমলে নেননি। যার কারণে দেশটির সরকার তাদেরকে উচ্ছেদে কঠোর অ্যাকশানে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।

এর আগে গত ১৬ জুলাই কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর ও দূতালয় প্রধান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্দেশে জানানো হয়, কুয়েত কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনা এড়াতে দেশটির হাসাবিয়া, আব্বাসিয়া এলাকায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে বসবাসরত বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ওই সব ভবন থেকে উচ্ছেদ করে হাসাবিয়ার একটি সরকারি স্কুলে অস্থায়ী শেল্টার হাউজে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশীদের সার্বিক অবস্থা দেখতে সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। উল্লেখ্য, শেল্টার হাউজে কুয়েত কর্তৃপক্ষ খাদ্য ও পানির ব্যবস্থাসহ এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছেন।